Showing posts with label গ ল্প. Show all posts
Showing posts with label গ ল্প. Show all posts

হারায়ে খুঁজি

গ ল্প

মিথিলা জান্নাত


স্কুলে আজ বাংলা টিচার ছাত্র-ছাত্রীদের স্বপ্ন ও ইচ্ছা সম্পর্কে জানতে চাইলেন। সবাই যে যার স্বপ্ন ও ইচ্ছা সম্পর্কে বলল। টিচার যখন আমার কাছে জানতে চাইলেন, তখন আমি বললাম, আমার স্বপ্ন হলো আমার মা ও বাবা দু’জনের আদর একসাথে পাওয়া। আমার স্বপ্নের কথা শুনে সবাই হেসে উঠল। টিচার অবাক হয়ে কিছুণ তাকিয়ে রইলেন। জানতে চাইলেন আমার এমন অদ্ভূত ইচ্ছের কারণ সম্পর্কে। আমি এক বিব্রতকর অবস্থায় পড়লাম। কারণ আমার এই ইচ্ছের পেছনে এমন এক ঘটনা আছে যা কেউ জানে না। কিন্তু আজ তাদেরকে এ বিষয়ে বলতে হবে। কিভাবে বলব আমি? আমি কি পারব সবার সামনে আমার অবস্থা তুলে ধরতে? জানি না। শুধু এটুকু জানি আমি চেষ্টা করব।

আমি আমার মা বাবার একমাত্র সন্তান। ছোটবেলা থেকেই আমি মা বাবাকে কখনো কাছে পাইনি। কারণ তারা দু’জনই ভীষণ ব্যস্ত। তাদের কাছে সন্তানের চেয়েও বড় হল তাদের ক্যারিয়ার। আমার ছেলেবেলা কেটেছে বাসায় বন্দী অবস্থায়। সকাল হলেই মা বাবা তাদের বিশ্বস্ত বুয়ার হাতে আমাকে রেখে তাদের অফিসে চলে যেতেন। সব সময় তাদের কি সব মিটিং থাকত। মাঝে মাঝে থাকত বিভিন্ন পার্টি। তাই তারা ঘরে ফিরতেন অনেক রাতে। সে সময় আমি হারিয়ে যেতাম ঘুমের রাজ্যে। আবার খুব সকালে তারা কাজে চলে যাওয়ায় তাদের সাথে আমার দেখা হত না। এমনকি ছুটির দিনও আমার জন্য তাদের কোন অবসর ছিল না। চার দেয়ালের মাঝে বন্দি হয়ে বড় হতে লাগলাম আমি। সবাই যখন তাদের মা বাবার হাত ধরে স্কুলে যায়, তখন আমি যেতাম আমার বুয়ার হাত ধরে। স্কুল ছুটি হলে সবাই যখন মাকে সারাদিন কি ঘটল তার বর্ণনা দিতে দিতে বাড়ি ফেরে, তখন আমি বুয়ার হাত ধরে চুপচাপ বাড়ি ফিরতাম। আমার স্কুলে প্যারেন্টস্ ডে’তে
অনেক বড় অনুষ্ঠান হত। সবাই তাদের মা বাবাকে নিয়ে আসত। কিন্তু আমি সেদিন স্কুলে যেতাম না। কারণ আমার মা বাবার ব্যস্ততা।

এভাবেই দিন কাটছিল আমার। কিন্তু একদিন ঘটে গেল অন্য এক ঘটনা। রাতে হঠাৎ একটি শব্দে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। দেখি মা বাবা দু’জনই ঝগড়া করছে। ভীষণ সিরিয়াসভাবেই তারা ঝগড়া করছে। কিছু বুঝতে পারলাম না আমি। পরদিন সকালে মা বাবা একসাথে কোথায় যেন গেল। দুপুরে তারা কেউ বাসায় আসল না। সেদিন বিকেলে আমার একমাত্র ফুপী বাসায় এসে আমাকে তার কাছে নিয়ে গেলেন। দেখলাম আমার ফুপীর বাসায় চাচারা অনেকেই আছেন। আমার মনে হল আমাকে দেখে তাদের মন করুণায় ভরে গেল। দাদু আমাকে জড়িয়ে ধরে অনেকণ কাঁদলেন। পরে আমাকে শোনান হল যে, আমার মা বাবা আর কখনো একসাথে থাকবেন না। কারণ তাদের ডিভোর্স হয়ে গিয়েছে। তখন আমার তেমন কোন ফিলিংস হলো না। মনে হলো মা বাবার আদর তো আমি এমনিতেই পাই না। কিন্তু পরে আমাকে নিয়ে তাদের অনেক সমস্যা হলো। আমি কার কাছে থাকব এটা নিয়েই সমস্যা। 

এক সপ্তাহ পর আমার মা বাবার সাথে আমার দেখা হলো আদালতে। তারা দু’জনই আমাকে কাছে রাখতে চান। বিচারক যখন আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আমি কার কাছে থাকব তখন আমি কোন উত্তর দিতে পারিনি। কারণ তাদের দু’জনকেই যে আমার ভীষণ প্রয়োজন। কিভাবে যেন আদালতের রায় হলো আমি মায়ের কাছে থাকব। কিছুদিন আমি তার কাছে থাকলাম। প্রায় এক বছর পর আমার নানা নানু তাদের একমাত্র মেয়েকে বিয়ে দেবার সিদ্ধান্ত নেয়। আমি দেখলাম মা কিছুদিন কান্নাকাটি করে পরে রাজি হয়ে যায়। মায়ের নতুন স্বামী মাকে নিয়ে বিদেশ চলে যায়। রেখে যায় আমাকে। এর কিছু দিন পর রোড অ্যাক্সিডেন্টে নানা নানু মারা যায়। এরপর আমি এলাম বাবার কাছে। কিন্তু বাবাও আবার বিয়ে করেছেন। নতুন মা আমাকে তার কাছে রাখতে রাজী নন। পুরোপুরি একা হয়ে যাই আমি।

পরবর্তীতে আমাকে দেখাশোনার দায়িত্ব নেন আমার নিঃসন্তান চাচা চাচী। তারাই এখন আমার বাবা মা। নতুন বাবা মা আমাকে অনেক বেশি আদর করেন। না চাইতেই এখন অনেক কিছু পাই আমি। কিন্তু তারপরও আমার মন খোঁজে অন্য কিছু। কোনদিন যদি আমার সত্যিকার মা বাবা এসে আমাকে জড়িয়ে ধরেন তবেই হয়তো আমি সব কষ্ট ভুলে যেতে পারব। সব কিছু হারাবার পরও আমি এখনও তাদেরকেই খুঁজি। সবসময় খুঁজি। 

অনেতিহাসের গল্প

গ ল্প
শাফাক বিন নুর

ঈশ্বরের উপর বিশ্বাসটা আমার বরাবরই নড়বড়ে ছিল। কারণটা জানার চেষ্টাও কোন সময় করিনি। কোন পিছুটান না থাকায় সব কিছু করতাম ইচ্ছে মত। কেউ কখনো একটু ডাক দিয়েও বলেনি, “ওটা করো, এটা করো না।” তাই আস্তে আস্তে সবার প্রতি আমার ঘৃণা বাড়ছিল। তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল আমার হতাশা। নিজেকে অনেকবার প্রশ্ন করেছি। উত্তর পাইনি। পরে বুঝেছি মনের দুয়ার বন্ধ রেখে কোন প্রশ্নের উত্তর পাওয়া আসলেই অসম্ভব। এরপর আরো, আরো  ভেবেছি। বুঝেছি ঈশ্বরকে বাদ দিয়ে নিজের অস্তিত্বের আসলেই কোন ভিত্তি থাকে না। শেষ সময়গুলোতে কেন জানি অতীতের এই সব কথাগুলো খুব বেশি মনে পড়ছে। শেষ সময় বলছি কারণ জনমানবহীন, প্রাণহীন কোন মরুপ্রান্তরে পড়ে থাকা নিঃসঙ্গ একজন মানুষ, যে গত চব্বিশ ঘন্টা যাবৎ বাকশক্তিহীন, স্রেফ অনুভূতিশক্তি দিয়ে সে আর কতণ টিকে থাকতে পারবে? যাই হোক, যখন থেকে ঈশ্বরকে বিশ্বাস করেছি, তখন থেকেই মনে জন্ম হয়েছে এক অপার্থিব অনুভূতির। আমি জানি না এর কারণ কি। না, এই অনুভূতিতে সুখ কিংবা দুঃখের কোন ব্যাপার নেই। আছে ভিন্ন কিছু। আচ্ছা, এটা কি ধরণের অনুভূতি? এই অনুভূতির দ্বারা একমাত্র মানুষ ছাড়া আর সবাইকে আমি ছুঁয়ে যেতে পেরেছি। মানুষকে আমি অনুভব করেছি, ভালোবেসেছি। কিন্তু মানুষ আমাকে ভালোবাসেনি, অনুভবও করেনি। সমগ্র মানব জাতির মূল্যায়নের মানদণ্ড যেন অর্থ-পুঁজি, মতা। আচ্ছা, এগুলোই কি জীবনের সবকিছু? জীবন তো এত ুদ্র না। তাহলে কেন জীবন এই সব জাগতিক চলকের হাতে বন্দী? হঠাৎই খেয়াল করলাম, মানুষ ছাড়া সমস্ত দুনিয়াই আমাকে ভালোবেসেছে। কিন্তু খেয়ালটা হলো অনেক পরে। নিজের কাছে নিজে আরো একবার হারলাম। দেখলাম দুনিয়া আমাকে তিরষ্কার না করে বরং কাছেই টেনে নিয়েছে। ভালোবেসেছে। আমাকে তারা কিছু একটা দিতে চেষ্টা করেছে...

ঈশ্বরের ইচ্ছাটা আমার কাছে সবসময়ই বড় বেশি রহস্যময় লেগেছে। তিনি আজ পর্যন্ত আমাকে সঙ্গীহীন, পরিবারহীন রেখেছেন। কেন? কেন তিনি আমাকে এমন এক সমাজের বাসিন্দা করেছেন, যেখানে যন্ত্রের মতো মানুষগুলো একজন  আরেকজনকে অনুভব করার, বুঝবার চেষ্টাটাও করে না? ...আচ্ছা, আমিও কি অবচেতন মনে কাউকে অবহেলা করেছি?

জীবনের শুরু থেকে এই মুহূর্ত পর্যন্ত একাকীত্বকে আমি অনুভব করেছি, ঘৃণা করেছি। একাকীত্বের যাতনা আমাকে তিলে তিলে গ্রাস করেছে। আমার সমাজ ব্যবস্থার প্রতিও আমি কখনোই কোন দুর্বলতা অনুভব করিনি। কেনই বা করবো? যে সমাজ মানুষকে স্বাভাবিকতা, মৌলিকতা আর মানবিকতার শিক্ষা দেয় না, সে সমাজের প্রতি আবার কিসের দুর্বলতা? তাই বহুদিন থেকেই জনমানবহীন কোন প্রান্তরে এক মানববসতি পত্তনের অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছি, যে সমাজ হবে আমার একার সৃষ্টি। যেখানে থাকবে না কোন নিষ্ঠুরতা, নির্মমতা। থাকবে সহমর্মিতা আর ভালোবাসা...

যখন থেকে ঈশ্বরকে মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেছি, আমার সকল কাজে তখন থেকেই তাঁর নীরব উপস্থিতির ছোঁয়া পেয়েছি। তবে এগুলোকে কোন সময় ব্যাখ্যা করতে চেষ্টাও করিনি। সমাজের প্রতি আকর্ষণ দিনে দিনে কমতে লাগলো আর সবার থেকে আলাদা হয়ে অন্য কোথাও চলে যাওয়ার আকক্সাও তীব্র হতে লাগলো, যেখানে এই সমাজের কোন কিছুই আমাকে স্পর্শ করবে না। মনের ভেতরে কাদের ডাক শুনতে পেতাম প্রতিনিয়ত, মনে হতো আমার স্বপ্নে দেখা সমাজের বাসিন্দারা আমাকে ডাকছে। এক সময় দরজার বাইরে পা রাখলাম। শুনলাম জানালার ওপাশ থেকে প্রিয় কণ্ঠের সুর বাজছে। আমি হতচকিত, মোহগ্রস্থ হয়ে গেলাম। আর এদিকে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আমার স্বপ্ন। কেন এমন হয়? এক পা ঘরের বাইরে অন্য পা ভেতরে দিয়ে দ্বিধা-বিভক্ত আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। এটাই কি আমার নিয়তি?...আমি বেরিয়ে পড়লাম। পেছনে পড়ে থাকলো সবকিছু...

এখন আমি যেখানটায় আছি, এটি বসবাসের জন্য সম্পূর্ণ অনুপযোগী একটি জায়গা। এই জায়গাকে তার বিপরীত অবস্থায় নেওয়ার জন্য আমি আমার জীবনের সবচাইতে কঠিন পরিশ্রম করেছি। আমি রাতদিন  কাজ করি আর অন্যদিকে আমার সমস্ত সঞ্চয় দিনে দিনে কমতে থাকে। এক সময় সমস্ত খাবার, পানি ফুরিয়ে গেলো। ধীরে ধীরে দুর্বল হতে লাগলাম। ুধায় পিপাসায় কাতর আমি এই মরুভূমির কোথাও পাইনি এক ফোটা পানি। ঈশ্বরের দয়া কি আর আসবে না, যেভাবে ধর্মগ্রন্থগুলোতে বর্ণিত হয়েছিল? আমার প্রাথমিক কাজ আমি শেষ করেছি। শুধু দরকার সামান্য বৃষ্টির। জানি আমার এই চাওয়াটা অবান্তর, কিন্তু এটা তো  অসম্ভব না। ুধা পিপাসা আর বৃষ্টির অপোয় কাতর আমি যখন বাকশক্তিহীন হলাম, তখন দেখলাম ধুলো-বালিরা আমার মনের কথা শুনছে। তাদের কাছেই বললাম আমার না বলা কথা। এখন হঠাৎ করেই কেমন জানি লাগছে। নিঃশ্বাস নিতে পারছি না। চোখের সামনে সবকিছু ঝাঁপসা হয়ে আসছে। আমি কি মারা যাচ্ছি? নাকি নতুন কোন জীবনে প্রবেশ করছি?

পরিশিষ্ট
হ্যাঁ, তিনি মারা গেছেন। ঈশ্বর এখানেও তাঁর রহস্যময় আচরণকে ধরে রেখেছেন, যে আচরণ বরাবরের মতোই ব্যাখ্যাতীত। মানুষটির মৃত্যুর পরে মরুভূমিতে সৃষ্টি হলো প্রচণ্ড মরুঝড়ের। ধূলো-বালিতে ঢাকা পড়লো তার লাশ। কিছুদিন পরে হঠাৎ প্রচণ্ড বৃষ্টিতে সিক্ত হলো রু মরুভূমির শুষ্ক প্রান্তর। সেই প্রাকৃতিক কবরের উপর জন্মালো মরুভূমির প্রথম গাছ। এরপর আরেকটি, তৃতীয়টি, চতুর্থটি...। কালের পরিক্রমায় মরুভূমিটি রূপান্তরিত হলো বনভূমিতে। সেখানে আশ্রয় নিল নাম না জানা অসংখ্য পাখি। এরপর কোন একদিন এক যাযাবর দল বনভূমির কোল ঘেঁষে বসতি গড়লো।

...আচ্ছা তাদের স্থায়ী বসতিটি কি সেই স্বপ্নদ্রষ্টার স্বপ্নের মতই হয়েছিল? না, এই প্রশ্নের জবাবের কোন দরকার নেই। একজন মানুষের সব স্বপ্ন পূরণ হতেই হবে এমন কোন কথা তো নেই।

মৎস্য-পুরাণ

গ ল্প
ওয়াহিদ সুজন


এক.
আমার জন্ম নদীতে। একদিন চোখ খুলে দেখি, নদীর জলে আমি ভেসে আছি। সাঁতরে তীরে উঠে গেলাম। আমার ভাই বোনেরা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। এছাড়া মৎস্যজীবন শুরুর কোনো স্মৃতি অটুট রইল না।

আমি যখন নদীর তীর ধরে হাঁটি আমার ভাই-বোনেরা নদীর জলে জেগে ওঠে। আমি নদীতে ঝাঁপ দিই। তাদের সাথে সাঁতার কাটি, খেলা করি। জলের জীবনে কোনো কান্তি নাই। কেমন যেন ভরশূন্য অনুভূতি। কখন যে আমার ভাই বোনদের সাথে পাখি হয়ে উঠি আমি নিজেও জানি না। মাঝে মাঝে আমার মাছ মাকে দেখতে ইচ্ছে করে। কিন্তু ওরা বলে নদীই আমার মা। হয়তো কোনো এক ধরনের ঠাট্টা। আমি সেই ঠাট্টা বুঝি না।

একদিন আমার এক ভাইকে মাছরাঙা পাখি তুলে নিয়ে গেলো। অন্যরা পালিয়ে গেলো খুব দ্রুত । আমি চুপচাপ জলে ভাসতে থাকলাম। আমার চোখের জল নদীতে মিশে গেলো। সেখান থেকে একখানা কচুরিপানা তৈরী হলো। আমি তাজ্জব হয়ে ল্য করলাম, সেই পানা’তে কতদ্রুত একখানা সাদা ফুল ফুটল। আমি সেই ফুলের নাম দিলাম দুঃখফুল। এতো চমৎকার ফুলের নাম দুঃখ হয় কী করে?

ততণে আমার অন্য ভাই বোনেরা ফিরে  এসেছে। তারা যেন খেলার নতুন সঙ্গী পেলো। ফুলটি খুব সহজে ওদের সাথে মিশে গেলো। এই যে একটু আগে একটা ভয়াবহ ঘটনা ঘটে গেল, তা নিয়ে এদের কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। আমার মন আরো খারাপ হয়ে গেল। গা শিরশির করে উঠল, যদি না বিশাল কোনো পাখি এসে আমাকে টুপ করে তুলে নিয়ে যায়! আর এরা একটু পরেই আমাকে ভুলে যাবে। আমার অভিমান হয়। অচিন অভিমান।

আমি দেখতে পেলাম ফাঁদে পড়া একটা মাছরাঙা। হয়তো সেই মাছরাঙাটাই। সে ফাঁদ থেকে মুক্ত হবার চেষ্টা করছে। আমি তাকে ছেড়ে দিলাম। মাছরাঙাটি আমার ঘাড়ে এসে বসল। আমি তার নাম জিজ্ঞেস করলাম, অমনি পাখিটি উড়ে গেলো।

আমি আর কী করি? তেমন কিছু না। বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াই... আর সেই নদীর তীর ধরে হাঁটি। তার শুরু আর শেষ খুঁজি। কিন্তু উত্তর পাই না। মনে হয় সবকিছুই আমার রূপান্তরের মতো। দিক চিহৃহীন কুয়াশায় মিশে গেছে। অথচ আমি দেখি, আমার আশপাশের মানুষেরা দিব্যি বলে দেয়, তারা সবকিছু জানে। আর আমি শুধু জানি, আমি মানুষের খোলসে আবদ্ধ একখানা মাছ। এইজন্যই কি আমার সীমাবদ্ধতা? আমার মা’ কে এই কথা বললে সে কেমন যেন দুশ্চিন্তায় মুখ থমথমে করে ফেলে।
বাবা বলে, “এটা আর কি? বাচ্চাদের কল্পনা। বড় হলে ঠিক হয়ে যাবে।”
আমি বড় হতে চাই না, কী চমৎকার মৎস্য জীবন!
সুদূর কোনো এক কালে ছিলো এক রাজপুত্র । কী এক অভিশাপে সে ব্যাঙ হয়ে গেলো। যদি কোনো রাজকন্যা তাকে চুমু খায়, তবে সে আবার মনুষ্য জীবন ফিরে পাবে। আমার বাবার মুখে সব’ চে বেশি শোনা গল্প এটি। হয়তো আমার বাবা একটাই গল্প জানতেন।

সারারাত ঘুমোতে পারি না। যেন আমাকে নিয়ে এই গল্প। শুধু উল্টো করে বলা।
বাবাকে বলি, “এটা কি সম্ভব?”
তিনি হেসে বলেন, “রূপকথার জগতে সব সম্ভব। সে জগত তো সত্য নয়। তাই একে মিথ্যে বলা যায়।”
আমি প্রশ্ন করি, “মিথ্যে হলে সে গল্প আসলো কেমন করে? তুমি তো বলো, মিথ্যে বলা ঠিক না। যদি এমন হয় এই জগতটা মিথ্যে আর গল্পটা সত্য?”
বাবা অবাক হয়ে বলেন, “দারুন বলেছিস, জ্ঞানীদের মতো। এটা যদি সত্য হতো, তাহলে তা আমরা বুঝতে পারতাম।”

আমি বুঝতে পারি সেই গল্প মিথ্যে না, কিন্তু এই মনুষ্য জীবনও তো মিথ্যে না। আমি মাছেদের কথা বুঝি, বলতে পারি। অথচ অন্যেরা পারে না।
বাবা বলেন, “যা শুধুমাত্র একজনের জন্য সত্য, অন্যদের কাছে তার মূল্য খুব কম।”
আমি এই কম মূল্যবান সত্য নিয়ে দ্বৈত জীবন যাপন করি। উভচর জীবন।

দুই.
আমি আমার মাছ ভাই বোনদের জিজ্ঞেস করি, তারা কখনো আমাকে কোনো অভিশাপ দিয়েছে কিনা। তারা অভিশাপ বিষয়টা বুঝলোই না। বুঝি তারা আমার চে আলাদা কিছু। আমি আস্তে আস্তে সাঁতার কাটি। আমার পায়ে শ্যাওলা জড়িয়ে যায়।
আমি শ্যাওলাকে প্রশ্ন করি, “কেন এমন হয়?”
সে বলে, “জানি না। আমরা এতটুকু জানি, যা হবার হবে। আমি একখানা শ্যাওলা- হয়তো মাছে খাবে, নয়তো রোদে শুকিয়ে মরবো।”

এতো নির্লিপ্ততা আমার সহ্য হয় না। এরা এতো নির্লিপ্ত কেন? নিজের ভেতর কেমন যেন বিদ্রোহ টের পাই। দুটো জিনিস একইসাথে আমার ভেতর ঘর করে- তা হলো, আমার মনুষ্য সত্তা সকল কিছুতেই তার মহাজনী কায়েম করতে তৎপর। আবার অন্যদিকে ভাষাগত আর ভাবগতভাবে আমি মৎস্য জীবনে প্রবেশ করি কিন্তু আলাদা হয়েও তার অস্তিত্ব জোরালোভাবে কোন কিছু দাবী করে না, তারমধ্যে উদাসীনতা, তন্ময়তা খেলা করে, ধরে নিয়েছি এমন হয়। এরা যে, একই সাথে কথা বলে তা না, বরঙ মনুষ্য সত্তা নিজেকে প্রাণপণে জাহির করতে তৎপর। হয়তো কখনো বা আমি আমার মৎস্য সত্ত্বাকে জোরালো করতে চাই, কিন্তু সে এই বিরোধের ধারনাকে অগ্রাহ্য করে। এখন এই বিষয়টাকে ভ্রম মনে হয়। কেন যেন মনে হয়, মানুষ সবসময় বিরোধ খোজে- তাই সে ছলনার বসত গড়ে। নিজেকে জাহির করতে না পারলে সে ম্বস্থি পায় না।
হঠাৎ হঠাৎ মনে হয়, সবকিছুই ঠিক। জগতের কোনো মানুষ বৃ, কেউ পাখি, কেউ আবার মেঘ। কেউ বুঝতে পারে, আবার কেউ পারে না। আমি বুঝি, এই হলো জনারণ্যে মিশে যাবার ছল। এটা হলেই বা তাতে তো আমার দ্বৈতজীবনের হেরফের হয় না। আমি একবার খেয়ালের বশে বৃরে একখানা ডাল ভাঙ্গতে যাই।
কে যেন আর্তচিৎকার করে বলে, “এই বড়ো অকারণ।”
আমি কেমন যেন ছটফট করি, নিঃশ্বাস নিতে পারি না, সারা শরীর জ্বলতে থাকে। আমি নদীর জলে ঝাঁপিয়ে পড়ি, জ্বালা জুড়োয়।
আমার ভাই-বোনেরা বলে, “এমন করতে হয় না।”
আরো বলে, “নিয়ম ভাঙ্গতে নেই।”
“কী সে নিয়ম?” তারা কোনো উত্তর দেয় না।

আমি নিজের ভেতর কারণ-অকারণের দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ি। ভেতর বাইরে প্রচন্ড কান্তি ভর করে। মায়ের কোলে মাথা রাখি।
মা’কে বলি, “মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দাও।”
মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। আহা, আমি যেন দখিনা হাওয়ার ভেতর সাঁতার কাটছি।

আমি স্বপ্ন দেখি, মৎস্য হয়ে ভেসে যাচ্ছি নদীর শেষ দেখব বলে। আমার পাশাপাশি আমার ভাই বোনেরা। আবার দেখি আমরা দল বেঁধে দখিনা হাওয়ার গান করছি আর উড়ে উড়ে তার উৎস খোঁজ করি। কী যেন একটা গান করি? ওহ, মনে পড়েছে।
“দখিনা হাওয়া, তোর বাড়ি কই। চেয়ে দেখ, জগতের তাবৎ পাখি তোর খোঁজে এসেছি উত্তর হতে, যেখানে মেঘ টইটুম্বর, খেলা করে খালে-বিলে।”
আবার দেখি, অনেক অনেক বৃরে মাঝে আমি একজন।
আমরা বলছি, “হে আমার অশ্র“ বিন্দু যা তুই উড়ে যা। আমার চিঠি পৌঁছে দিয়ে ফিরে আয় আকাশে।” আমাদের অশ্র“ উড়ে উড়ে সুনীল আকাশটাকে মেঘলা করে দেয়। এ যেন বৃরে দল উড়ে গেল আকাশে...

এবঙ
এখন আমি নিজেকে নিবিড় করে আর অনুভব করি না। নদী নামক ধূ ধূ বালু চরে বসে থাকি। কখনো কখনো ডাঙ্গায় তোলা মাছের মতো খাবি খাই। আমার মৎস্য সত্তা দিন দিন নিঃশেষ হয় নিজেতে। কখনো মনে হয় ঘ্রাণ শক্তি কমে গেছে। আগের মতো ফুলের তীব্র সুবাস হৃদয়ে কথা বলে ওঠে না। অনেক রঙ নিজেদের বৈচিত্র্যতা হারিয়ে ফেলেছে। চারপাশে বর্ণহীনতার খেলা।

আমি জেনে গেছি, মনুষ্যজীবনের অভিশাপ- সে ভয়ানক নিঃসঙ্গ। সব থেকেও তার কিছু নাই।

এই বালুচর একদিন ছিল আমার তীর্থ। সেদিন এই বালুচর ছিলো না, এখন বিশ্বাস হতে চায় না। সত্যি, সময় আজব ঘটনা। আর আমার ভাই-বোনদের সাথে শেষ দেখা...
আমি ভুলে যেতে চাই।

ভালবাসার স্পর্শ

গ ল্প
আসমা সাদেকা

মা মারা গেলে বিষয়টা স্বাভাবিকভাবে নিতে পারছিলাম না কিছুতেই। নিজেকে বেশ একা মনে হচ্ছিল। খুব অল্প বয়সে মাকে হারিয়ে আমি অসহায় বোধ করলাম। আমার এই বিষণœতা বাবাকে ভীষণ কষ্ট দেয়। বাবা আবার বিয়ে করেন। নতুন মাকে দেখে মনে হল আমি যেন মাকে ফিরে পেয়েছি আবার। মায়ের প্রতি ভালবাসার কমতি ছিল না আমার। তবে কখনো বুঝার বা ভাবার চেষ্টা করিনি মা আমাকে ভালবাসে কি না। ধীরে ধীরে সংসার বড় হল। বুঝতে পারি আমাকে সকলের বোঝা মনে হচ্ছে। মায়ের ভালবাসার মধ্যে কৃত্রিমতা আমি উপলব্ধি করতে থাকি। আমি তাদের যতই কাছের মনে করি না কেন আমাকে তারা আপনভাবে দেখেনি কখনো। মাকে ভালবেসেছি প্রচুর। আর ভাই বোনেরা ছিল আমার এক একটা অঙ্গ। কিন্তু আমাকে তারা আপন করে নেয়নি কখনো তা বুঝতেই পারলাম না কিছুতেই। তাদের ভালবেসে এতই অন্ধ হলাম আমার প্রতি তাদের হীনতা, অবজ্ঞার ভেতরেও আমি ভালবাসা খুঁজে পেতাম। মায়ের আসল রূপ ধরা পড়ে বাবা মারা যাওয়ার পর। তখন বোঝার বয়স আমার হয়েছে। পরিবারের নগন্য সদস্য ছিলাম আমি। মায়ের ঘৃণা, ভাই বোনের তিরষ্কার আমাকে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে দিল। ফেলে আসা অতীতগুলো সব স্বপ্ন মনে হলো। সম্পত্তির লোভ মাকে এতই পেয়ে বসেছিল যে, আমার ভালবাসা তাদের ছলনা মনে হল। আমাকে এই আশ্রমে রেখে চলে গেল সবাই। আমি নিস্তব্ধ দাঁড়িয়ে ছিলাম। মা একবারও ফিরে তাকালো না পেছনে। এত ঘৃণা আমার প্রতি মায়ের? নিজেকে প্রশ্ন করলাম। সব জেনেও মাকে ঘৃণা করতে পারছিলাম না কিছুতেই। কেন জানি না, উল্টো মায়ের প্রতি ভালবাসা ও তাকে কাছে পাওয়ার আশা দিন দিন বেড়েই চলছিল।

এভাবে আশ্রমে কেটে গেল ১৬টি বছর। এই ১৬ বছরে প্রতিদিনই আমি গেটের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। ভাবতাম মা আসবে। একটু হয়তো দেরী হচ্ছে। কিন্তু আসবে। মায়ের দেখা মিলেনি একবারও। তবে আশা আমি ছাড়িনি। বয়স এখন ৩৭-এর কোঠায়। একটি এনজিওতে চাকরি করছি। বিয়ে করিনি কারণ তেমন ইচ্ছে আমার ছিল না কখনোই। রানু ও প্রাপ্তির বিয়ে হয়েছে। রানুর দু’টি ছেলে। সবুজ লন্ডনে থাকে। পড়াশুনাও করেছে ওখানে। শুনে খুব ভাল লাগল। মায়ের আশা পূরণ হয়েছে। তার সন্তানেরা মানুষের মত মানুষ হয়েছে। রাজীব আমার বন্ধু। সে আবার প্রাপ্তির শশুড়বাড়ীর আত্মীয়। তার থেকে যত সব খবর পাওয়া। রাজীব বহু কষ্টে মায়ের ঠিকানাটা আমাকে এনে দিয়েছিল। ঠিকানাটা হাতে পাওয়ার পর মাকে আর দেখতে ইচ্ছে হচ্ছিল না। তবে আমিই অনেক কষ্টে রাজীবকে ঠিকানাটা এনে দিতে রাজি করিয়েছি। কিন্তু ঠিকানাটা পড়েই দেখিনি। হাতে কাগজটা নিয়েই ছিঁড়ে ফেলে দিলাম। এত বছরে এই প্রথম মাকে ঘৃণা হচ্ছে। “মা, একবারও কি আমার কথা মনে পড়লো না তোমার? হয়তো আমাকে তুমি জন্ম দাওনি তবে তোমাকে আমি মা বলে ডেকেছি। তোমাকে কাছে পাওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত আমার জন্মদাত্রী মায়ের কথা একবারও মনে পড়েনি। যতবারই মা’র কথা চিন্তা করেছি, শুধু তোমাকেই সামনে দেখেছি। আর শুধু তোমার জন্য দু’চোখ জলে ভাসিয়েছি।” রাজীবের সামনে যখন এসব কথা বলছিলাম, তখন দেখি সে কাঁদছিল তবে আমার মোটেও কষ্ট হচ্ছিল না। আসলে আমার কিছুই অনুভব হচ্ছিল না। শুধু বাবাকে মনে পড়ছিল। আজ যদি বাবা থাকত তবে হয়তো আমার জীবনটা এমন হতো না। আমার চারপাশে আপন বলতে কেউ ছিল না। বন্ধু হিসেবে হাত বাড়িয়েছিল রাজীব। জীবনে এই একটাই ভাল বন্ধু পেয়েছি। তার বৌটাও বেশ ভাল ছিল, নাম নীলা। আমাকে বড় বোনের মত শ্রদ্ধা করত। রাজীব ও নীলার বিয়ের পরপরই বন্ধুত্বের গভীরতা অনেকাংশে কমে গিয়েছিল। তখন দেখা হত হঠাৎ। আমি মাঝখানে ভীষণ বিষন্নতায় ভুগছিলাম। নিজের বেঁচে থাকার কোন কারণ বা ল্য খুঁজে পাচ্ছিলাম না, তাই নিজের অস্তিত্বকে মিটিয়ে দেব ভেবেছিলাম। কিন্তু তখনই আমার কাছে আসে অর্পিতা, রাজীব আর নীলার মেয়ে। অর্পিতার যখন ৩ বছর বয়স, রাজীব ও নীলা কার অ্যাক্সিডেন্টে মারা যায়। নীলা মৃত্যুর আগে অর্পিতাকে আমার হাতে তুলে দেয়। সেই থেকে নতুন জীবন আমার। আমি মা হয়েছি।  পৃথিবীতে বেঁচে থাকার এক নতুন উদ্যম খুঁজে পেলাম। মা ও মেয়ের সুখের সংসার। আজ অর্পিতার জন্মদিন। ওর বয়স এখন ১২। ঠিক করেছি তাকে আজ বলব তার আসল মা বাবার কথা। কিভাবে নেবে সে, তা জানি না। তবে আমার বিশ্বাস আমার ভালবাসা তাকে আমার কাছ থেকে কখনোই দূরে নিতে পারবে না। বরং আমার আরো অনেক কাছে টেনে আনবে। তবে আবার ভয় হয়, আমাকে সে ভুল বুঝবে না তো? “অর্পিতা, মা হারানোর কষ্ট আমি সহ্য করতে পেরেছি তবে সন্তান হারানোর কষ্ট আমি সহ্য করতে পারব না। জন্ম হয়তো আমি তোমাকে দেইনি। তবে ভালবাসায় বিন্দুমাত্র কৃত্রিমতা আমার না ছিল, না আছে, না থাকবে। আজ তোমার জন্মদিনে তোমাকে সব জানাবো। উপহার হিসেবে দেব তোমার মা আর বাবার ছবি। আর ১ ঘন্টা পরে তুমি ঘুম থেকে উঠবে। আমি সে সময়ের অপোয়, কখন তুমি উঠবে আর তোমাকে জড়িয়ে ধরব। আজকের সকালটা কেমন হবে কে জানে? আজ কি আকাশ কালো মেঘে ঢেকে যাবে নাকি সোনালী রোদে চারপাশ আলোকিত হয়ে উঠবে? আজ প্রকৃতিও তোমার অপোয়। সে সাজবে তোমার রঙে। তোমার প্রতিটা ণ যেন শুভ হয় আর ভোরের আলোর মত স্নিগ্ধ থাকে সেই প্রচেষ্টায় থাকব সারা জীবন। “শুভ জন্মদিন মেয়ে”।

তোমার রূপকথার গল্পগুলো

গ ল্প
মাসউদুর রহমান


পথ
দীর্ঘ এক পথ, যোজন যোজন লম্বা। অনতিক্রম্য মহাদৈর্ঘের এ পথ। পথের দু’দিকের দু’টি শেষ বিন্দুতে দু’জন ব্যক্তি দাঁড়িয়ে- আমি আর তুমি। দূরত্ব এত যে, কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। কিন্তু আমরা একে অপরকে অনুভব করতে পারছি। তাই আমি যখন এক কদম হেঁটে সামনে গেলাম, আমি বুঝতে পারলাম আমাদের দূরত্ব দু’কদম কমে গেছে। হঠাৎ মনে হলো, এভাবে পথ কি কখনো শেষ হবে, না আমরা কেউ কাউকে দেখতে না পাওয়ার বেদনা নিয়ে মাঝ পথে মাটিতে মিশে যাবো? আমি জানি, তুমিও তাই ভাবছো। অনতিক্রম্য এই দূরত্ব আমাকে এবং তোমাকেও দ্বিধান্বিত এবং হতাশাগ্রস্থ করে তুলছে। কিন্তু আমরা তো পরস্পরকে ভালোবাসি। কেউ কাউকে পাই আর না পাই, দেখি আর না দেখি, তাতে কী? আমাদের ভালোবাসা আমাদের ব্যাথা উপশম করবে, আমাদের না পাওয়াকে পুষিয়ে দেবে, অ-দেখাকে মানিয়ে নেবে। তুমিও নিশ্চই এভাবেই ভাবছো আর এ-ও ভাবছো যে ফিরে যাবে, কারণ আমিও যে ফিরে যাবার কথা ভাবছি।
ভাবতে ভাবতে মনের কোণে এক টুকরো বেদনা নিয়ে ঘুরে দাঁড়ালাম। আমার সামনে মাটিতে এক জোড়া পা দেখতে পেলাম। দৃষ্টিটা ক্রমান্বয়ে উপরের দিকে তুলতে তুলতে এক জোড়া হাত, একটা শরীর আবিষ্কার করলাম আমার সামনে। দেখলাম আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছো তুমি এবং আমিও তোমার দিকে।
কী আশ্চর্য! পৃথিবীটা যে গোল সেটা আমরা ভুলেই গিয়েছিলাম!

আজ্ঞাবাহী
নারী ও পুরুষের প্রেমের মাধ্যমে আমার জন্ম হয়নি, আমার জন্ম ঈশ্বরের হাতে, অনেকটা আদমের সৃষ্টির মতো। তবে আমাকে সৃষ্টির প্রতিটি প্রক্রিয়ার শেষেই ঈশ্বর আমাকে একবার করে জিজ্ঞেস করতেন, “ভেবে দেখো, জন্মাবে কিনা, তুমি যদি না চাও, তবে তোমার জন্ম প্রক্রিয়া এখানেই বন্ধ করে দিই।” আমার সর্বদা একটাই উত্তর ছিল, “না, আমি জন্মাতে চাই।” এভাবে এক বিন্দু জমাট রক্ত থেকে এক টুকরা মাংস, মাংসের ভেতরে হাড়-গোড়, ধীরে ধীরে হাত-পা এবং এক সময় এই পূর্ণ ‘আমি’টার জন্ম হয়। জন্মাবার পর ঈশ্বর আমাকে তোমার কাছে পাঠালেন, তোমার অধীন করে। আমার ভাগ্যলিপিতে ঈশ্বর এটাই লিখে দিয়েছিলেন। এখন তোমার ইচ্ছাই আমার ইচ্ছা। আমার মুখ দিয়ে এখন যে কথা বেরোয়, তা আসলে তোমার কথা। আমার নিজের কোন দাবী নেই, তোমার যেটা দাবী সেটা আমারও। তুমি গাইতে বললে আমি গাই। তুমি যখন হাসো, তোমাকে খুশি করার জন্য আমিও হাসি, কারণ তোমার খুশিতে যে আমাকেও খুশি হতে হয়। আমার নিজের কোন চাওয়া-পাওয়া নেই, দিন-রাত নেই, স্বপ্ন নেই, বাস্তবতা নেই, তোমার যা আজ্ঞা, তা-ই আমার আজ্ঞা। তোমার থাকলে আমার আছে, তোমার না থাকলে আমারও নেই। ঈশ্বর আমার ভাগ্য খাতায় এটাই লিখে রেখেছেন। তুমিও আমার উপর প্রচণ্ড খুশি। এরকম পরম আজ্ঞাবাহী কি আর পাওয়া যায়!
জানি না তুমি খুশি হয়ে ঈশ্বরকে কখনো ধন্যবাদ দিয়েছো কি না। যদি না দিয়ে থাকো, তবে ভালো করেছো। কারণ ঈশ্বর আমার কপালে আরো একটা কাজ নির্ধারণ করে রেখেছেনÑ আমার হাতে তোমার মৃত্যু।

গল্প
ধরো, আমরা দু’জন সামনা সামনি বসে আছি, গল্প করবো। ঠিক হলো, আজ তুমি গল্প করবে আর আমি শুনবো। আবার ধরো, আমি অন্যকোন একদিন তোমাকে গল্প শুনিয়েছিলাম, তাই আজ তোমার পালা। তুমি শুরু করলে তোমার গল্প, বললে, “ভাবো,” আমি বললাম, “কি ভাববো?” তুমি বললে, “ভাবো, একটা সিংহের খাচা একপাশে আর একটা বাঘের খাচা অন্যপাশে। মাঝখানের শূন্য জায়গাটাতে তুমি।” আমি খুব আগ্রহে কান পাতলাম। আমার আগ্রহ দেখে তুমি ভাব নিলে, “থাক, এটা আজ আর না বলি।” “কেন? আজই বলতে হবে,” আমি প্রতিবাদ করলাম। “ঠিক আছে, ঠিক আছে, শোন।” তুমি মৃদু হাসলে। ফের শুরু করলে, “তোমাকে আমি বললাম, বাঘ কিংবা সিংহ যে কোন একটা খাচায় তোমাকে প্রবেশ করতে হবে। তুমি কোনটাতে যাবে?” তুমি আমাকে প্রশ্ন করলে। ক্ষুধার্ত বাঘ, ক্ষুধার্ত সিংহ, একই কথা। তুমি যেটাতে ফেলতে চাও।” আমি হেসে উত্তর দিলাম। তুমি কিছুটা গম্ভীর হয়ে বললে, “বাঘের খাচায়। কিন্তু সেখানে পাঠানোর আগে আমার সঙ্গীরা তোমার হাত-পা বেঁধে ফেলবে। তারপর তোমাকে সেখানে নিপে করবে।” আমি হাসলাম, বললাম, “বেশ।” তোমার গলা খাদে নামিয়ে, কণ্ঠে আরো বেশি গভীরতা এনে, চেহারায় আরো বেশি কাঠিন্য এনে, তুমি আমার খুব কাছে মুখ নিয়ে এসে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলে, “তোমাকে একটা প্রশ্ন করবো?” “করো।” আমি বড় বড় চোখে বললাম। তুমি শুরু করলে, “আমি তোমাকে দু’টি পছন্দ দেবো, এক, বাঘের খাচায় গিয়ে আপোষে তুমি বাঘের খাদ্য হয়ে যাবে, দুই, হাত-পা বাঁধা অবস্থায় তুমি বাঘের সাথে লড়াই করবে।” তোমার গলার স্বর অদ্ভুতভাবে কাঁপছিল। আমি স্থির দৃষ্টিতে তোমার দিকে তাকালাম। তুমি দু’চোখ বন্ধ করে ফেললে, মনে হয় আমার উত্তর শুনতে ভয় পাচ্ছো। “আমি বাঘের সাথে লড়াই করবো, হাত-পা বাঁধা অবস্থায়।” তোমার বন্ধ করা চোখ দু’টির দিকে তাকিয়ে আমি বললাম। একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়তে ছাড়তে তুমি চোখ খুললে। উঠে দাঁড়ালে এবং ফিরে গেলে। পেছন ফিরে বলে গেলে, “কোন বোকা লোকের সাথে আমার বন্ধুত্ব থাকতে পারে না।”

কাঙ্খার পাপে
ওদের দু’জনেরই বয়স ৩০। কিন্তু তাদের একজন বিবাহিত, অন্যজন অবিবাহিত। দুইজনই গেল ঈশ্বরের কাছে, একটা প্রার্থনা করতে। প্রথমে গেলো অবিবাহিতজন। ঈশ্বর জানতে চাইলেন, “তোমার কী আবেদন পেশ করো।” অবিবাহিত বললো, “পৃথিবীর সবচে’ সুন্দরী কুমারীটি আমাকে দিন।” “তাকে তোমার কী প্রয়োজন?” ঈশ্বর প্রশ্ন করলেন। অবিবাহিত উত্তর দিলো, “এ আমার সারা জীবনের স্বপ্ন।” ঈশ্বর বিরক্ত হলেন, “এটা কি একজন মানুষের সারা জীবনের স্বপ্ন হতে পারে? ঠিক আছে, পৃথিবীর সবচে’ সুন্দরী কুমারীটি আমি তোমাকে দিলাম। তবে এ জন্য তোমাকে আরো আঠারো বছর অপো করতে হবে”- ঈশ্বর শর্ত দিলেন। “আমি প্রতীক্ষা করতে রাজী আছি”- দৃঢ় কণ্ঠে অবিবাহিত উত্তর দিলো এবং ফিরে গেলো।
এবার বিবাহিত এলো ঈশ্বরের কাছে। ঈশ্বর তার কাছেও জানতে চাইলেন, “কী আবেদন তোমার, পেশ করো।” অত্যন্ত বিনীত হয়ে সে চাইলো, “পৃথিবীর সবচে’ সুন্দরী কুমারীটি আমায় দিন।” ঈশ্বর বাঁকা চোখে চেয়ে বললেন, “কিন্তু তুমি তো বিবাহিত?” “আমি আমার স্ত্রী’র উপর সন্তুষ্ট নই”Ñবিবাহিত উত্তর করলো। ঈশ্বর মৃদু হাসলেন। তারপর অনুভূতিহীন দৃষ্টিতে বিবাহিতকে দেখলেন। বললেন, “ঠিক আছে, পৃথিবীর সবচে’ সুন্দরী কুমারীটি আমি তোমাকে দিলাম।” বিবাহিতজন অত্যন্ত খুশি হয়ে ফিরে গেলো।

...কিছুদিন পর, বিবাহিতের স্ত্রী একটি কন্যা সন্তানের জন্ম দিলো। তার মুখ দেখে বিবাহিত খুব দুঃখ পেলো। বুঝতে পারলো, ঈশ্বর তাঁর প্রতিশ্র“তি পূরণ করেছেন। ১৭ বছর পর মেয়েটির মা-বাবা এক দুর্ঘটনায় মৃত্যু বরণ করে। তার ১ বছর পর পিতৃ-মাতৃহীন অসহায় ঐ মেয়েটিকে তার আত্মীয়-স্বজনেরা তার চে’ ৩০ বছরের বড় প্রায় বৃদ্ধ এক লোকের সাথে বিয়ে দেয়। এটি ছিলো লোকটির প্রথম বিয়ে।

ঈশ্বর! দয়া করে বলবেন কি, মেয়েটার কী অপরাধ ছিল?

একটি মৃত্যু সংবাদ
ধরো, তুমি একটা গাছ হলে আর আমি এক পথিক। মনে করো, সময়টা মধ্য দুপুর। সুর্যটা তার সবটুকু প্রাণশক্তিকে আমার মাথায় ঢেলে দিচ্ছিল। আমার পে আর পথচলা সম্ভব হচ্ছিল না। আমি যখন তোমার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, তুমি আমায় ডাকলে, “পথিক, বসে যাও দু’দণ্ড। আমার ছায়ায় তোমার ভালো লাগবে।” ঘামে সিক্ত শরীরটা নিয়ে আমি তোমার শেকড়ে মাথা রেখে শুয়ে পড়লাম, যেন তোমার কোলে মাথা রেখেছি। তুমি তোমার ডালপালাগুলো অনেক নিচে নামিয়ে আনলে যাতে ছায়াটা আরো বেশি গাঢ় হয়। তোমার পাতাগুলো আলতো আলতো দোলাতে লাগলে, মনে হলো আমার মাথায় যেন তুমি হাত বুলিয়ে দিচ্ছো। মৃদু বাতাস তোমার পাতার ফাঁক দিয়ে যাবার সময় এমনভাবে শব্দ উৎপাদন করছিলো, মনে হয় তুমি আমার কানে ফিসফিসিয়ে কিছু বলছো। আমি চোখ বুজে কান পেতে রইলাম। “কতদূর যাবে?”-তুমি জানতে চাইলে। “জানি না”- ক্লান্ত স্বরে আমি বললাম। “জানো না!”-তুমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলে। “না”- আমি অস্ফুট স্বরে বলতে লাগলাম, “শুধু জানি, এ পথ ধরে আমাকে চলতেই হবে।” “এত কষ্ট করে কী লাভ? আমার কাছে থেকে যাও, আমি তোমাকে পরম শান্তিতে ঘুম পাড়িয়ে রাখবো, রৌদ্র-তাপ তোমাকে স্পর্শও করতে পারবে না, তোমার শরীরে কখনো কান্তি আসতে দেবো না, তোমার প্রশান্তির জন্য যা যা প্রয়োজন, তা-ই তোমাকে আমি দেবো। তুমি কেবল আমার কাছে থেকে যাও”- এক নিঃশ্বাসে তুমি সবটুকু কথা বললে, যেভাবে প্রচণ্ড নেশাগ্রস্থ কেউ এক নিঃশ্বাসে একটা বোতল খালি করে ফেলে। আমার চোখে ততণে রাজ্যের ঘুম নেমে এসেছে। আমি ঘুম জড়ানো কণ্ঠে তোমাকে বললাম, “নাহ্। সেটা সম্ভব না, আমাকে যেতেই হবে।” তুমি কিছুই বললে না। একদম নিশ্চুপ হয়ে গেলে। প্রচণ্ড ঝড়ের আগে প্রকৃতি যেভাবে শান্ত হয়ে যায় সেভাবেই তুমি নিরব-নিস্পন্দ হয়ে গেলে। আমি নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। কারণ তুমি যে মাতৃময়ী, সেটা আমার জানা ছিল। কিন্তু তুমি যে রাসী সেটা আমার জানা ছিলো না। যখন জানতে পেরেছিলাম, তখন অনেক দেরী হয়ে গেছে, আমার আর কিছুই করার ছিলো না...

পরিশিষ্ট: সেদিন বিকেলে নদীর ধারের মাটির রাস্তাটা দিয়ে হেঁটে যাবার সময় বড় গাছটার নিচে সবাই একটা লাশ পড়ে থাকতে দেখলো। লোকটা হয়তো বিশ্রাম নিচ্ছিলো, প্রচণ্ড বাতাসের তোড়ে গাছটার একটা বড় ডাল লোকটার মাথার উপর ভেঙ্গে পড়ায় তার মাথাটা একেবারে থেতলে গিয়েছিলো। এতেই তার মৃত্যু হয়। স্থানীয় সংবাদপত্রে খবরটা এভাবেই ছাপা হয়।


পাঠক সংখ্যা

free counters