প্রভোর
প্রথম বর্ষ প্রথম সংখ্যা আগস্ট ২০১০
সূচীপত্র
সম্পাদকীয়
.
অনুগদ্য
ইমরান সিফতি
রাফসান গালিব
.
গদ্য
আমরা সচেতন! আমরা শিক্ষিত! - আসবাবীর রাফসান
.
গল্প
হারায়ে খুঁজি - মিথিলা জান্নাত
অনেতিহাসের গল্প - শাফাক বিন নুর
মৎস্য পূরাণ - ওয়াহিদ সুজন
ভালোবাসার স্পর্শ - আসমা সাদেকা
তোমার রূপকথার গল্পগুলো - মাসউদুর রহমান
.
দিনলিপি
আসমা সাদেকা
.
কবিতা
রাফসান গালিব
ফারাহ্ শারমিন ঊর্মি
শহিদুল ইসলাম
মঈদ উদ্দিন তৌহিদ
.
নিবেদিত কবিতা
ত্যাগকাব্য ভালোবাসায় - রাফসান গালিব
.
একাঙ্কিকা
একান্তের সাড়া - শারমিন আকতার জুঁই
Showing posts with label প্রথম বর্ষ প্রথম সংখ্যা. Show all posts
Showing posts with label প্রথম বর্ষ প্রথম সংখ্যা. Show all posts
সম্পাদকীয়
১.
বিনীত
সম্পাদনা পর্ষদ
আমরা প্রতিনিয়ত দেখি। পরিবার, প্রেম, ডিভোর্স, জঙ্গি, ফেসবুক, শেয়ার বাজার, নির্বাচন, এশিয়ান হাইওয়ে, টিপাইমুখ, পিলখানা, পথশিশু, হকার, মসজিদের জুতাচোর, ব্যাংকের ঋণখেলাপি, অন্ধকার রাস্তার প্রস্টিটিউট, সর্বোপরি একটি ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন এখন আমাদের নিত্য দিনের দেখার বিষয়। ইনকামিং-এ ফ্রি আউটগোয়িং, সাবান কোম্পানীর আয়োজনে ঘসামাজা করা সুন্দরীদের দৈহিক হাসি কিংবা টুথপেস্টের কল্যাণে গায়ক হয়ে উঠা, অথবা এফএম রেডিওতে ঘন্টার পর ঘন্টা রেডিও জকিদের বিশেষ আবেদনময় লেকচারের মোহে আচ্ছন্ন, উত্তেজিত হয়ে থাকার যুগ এখন। তাই মনপুরা দেখে আমরা যতটা না উত্তেজিত হই, টিপাইমুখ শুনে যেন ঠিক ততটাই স্তব্ধ, ঠাণ্ডা হয়ে যায় আমাদের রক্ত, আমরা যারা এই প্রজন্মের, এই সময়ে বেড়ে উঠছি, তাদের। ‘আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান’ বলাটা এখন যতটা না দায়িত্ববোধের দায় গ্রহণ করে, তার চে’ বেশি সামাজিক স্ট্যাটাস রার ব্যাপার। জাতীয় কবির ভাষায়, “বোনাফাইড বাঙালি ছেলেদের ‘ফল-ইন-লভ’-টাই রপ্ত হয়ে গেছে, লড়ালড়ির ‘ফল-ইন’টা তাদের হয়ে শতাব্দী পূর্বে পিতৃপুরুষেরাই করে গেছেন।”
২.
আমরা কি তবে উন্নয়ন আর প্রগতির নামে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর সেই যন্ত্রমানবদের যুগে প্রবেশ করছি? আমাদের চাহিদা, পছন্দ, রুচিবোধ, সম্পর্ক সবকিছুই যেন এই যন্ত্রের ঠিক করে দেয়া নীতিতে চলছে। আমরা কেউ মুক্তভাবে ভাবতে পারি না, যেভাবে সে ভাবতে বলে সেভাবেই ভাবি, হাসতে পারি না নিজের মতো, যে ঢঙে সে দেখিয়ে দেয় সে ঢঙেই হাসি, জাগতে পারি না, কাঁদতেও পারি না। এই যান্ত্রিক সভ্যতা আমাদের ভেতর থেকে মানবিকতা কেড়ে নিয়ে আমাদের খালি দৌড়াচ্ছে আর দৌড়াচ্ছে। আমাদের দেহে এমন গতির সঞ্চার করেছে, যার উত্তরাধিকার আমরা নই। ফলে আমাদের কাছে তা দুর্গতি হয়ে উপস্থিত হয়েছে।
৩.
চারিদিকে যখন ফ্রি এসএমএস আর চ্যাটিং-ব্লগিং এর জয়-জয়াকার, তখন আমরা মজেছি গল্প লেখায়, কাব্যচর্চায়, মগ্ন হয়েছি সাহিত্যের সৃজনশীলতায়। কারণ সভ্যতার এই যান্ত্রিকতার প্রদোষে হারিয়ে যেতে থাকা মানবিক বোধ-অনুভূতিগুলো কেবল কবিতাই পারে বুঝতে, গল্পই তাদের গতি-প্রকৃতির বর্ণনা দিয়ে সেগুলো আবার দেখিয়ে দিতে পারে। যন্ত্রের ভেতর বন্দী হয়ে থাকা মানুষের সৃজনশীল বোধগুলোকে কেবল সাহিত্যই পারে মুক্তি দিতে।
আমরা যন্ত্রের বিরুদ্ধে নই, যে কোন ধরণের যান্ত্রিকতা, যন্ত্রের বিষম ব্যবহারের বিরুদ্ধে। আমাদের সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে আমরা এই যান্ত্রিকতার, যন্ত্রের জান্তবতার মুখোমুখী হতে চাই, একে মোকাবেলা করতে চাই। সমাজ ও রাষ্ট্র বিমুখ চিন্তাধারাকে আমরা ঘৃণা করি। সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহ আমাদের সবকিছু নিয়েই ভিন্নভাবে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে। আমাদের এই মূহুর্তের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দাবী- এক. টিপাইমুখ প্রতিহত করা হোক, দুই. এশিয়ান হাইওয়ে বাস্তবায়নে বাংলাদেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকারে বিবেচনা করা হোক, তিন. যুদ্ধাপরাধীদের বিচার যত দ্রুত সম্ভব বাস্তবায়ন করা হোক, চার. নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য জনসাধারণের আয়ত্বে আনার ব্যবস্থা করা হোক, পাঁচ. গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হোক।
৪.
এ মাসের ৯ তারিখ প্যালেস্টাইনের মাতৃভূমিহারা স্বাধীনতাকামী মানবতার কবি মাহমুদ দারবিশের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। তাঁর প্রতি আমরা বিনীত শ্রদ্ধা ও সম্মান জানাই। প্রভোরের প্রথম সংখ্যাটি তাঁকে নিবেদন করছি। একই সাথে প্যালেস্টাইনে ইসরাইলি দখলদারিত্ব ও হত্যাযজ্ঞের উদ্দেশ্যে তীব্র ঘৃণাযুক্ত প্রতিবাদ জানাই।
৫.
পৃথিবীর যত মন্দ আছে, তা ভাল হোক, ভাল হোক ভাল।
বিনীত
সম্পাদনা পর্ষদ
হারায়ে খুঁজি
গ ল্প
মিথিলা জান্নাত
মিথিলা জান্নাত
স্কুলে আজ বাংলা টিচার ছাত্র-ছাত্রীদের স্বপ্ন ও ইচ্ছা সম্পর্কে জানতে চাইলেন। সবাই যে যার স্বপ্ন ও ইচ্ছা সম্পর্কে বলল। টিচার যখন আমার কাছে জানতে চাইলেন, তখন আমি বললাম, আমার স্বপ্ন হলো আমার মা ও বাবা দু’জনের আদর একসাথে পাওয়া। আমার স্বপ্নের কথা শুনে সবাই হেসে উঠল। টিচার অবাক হয়ে কিছুণ তাকিয়ে রইলেন। জানতে চাইলেন আমার এমন অদ্ভূত ইচ্ছের কারণ সম্পর্কে। আমি এক বিব্রতকর অবস্থায় পড়লাম। কারণ আমার এই ইচ্ছের পেছনে এমন এক ঘটনা আছে যা কেউ জানে না। কিন্তু আজ তাদেরকে এ বিষয়ে বলতে হবে। কিভাবে বলব আমি? আমি কি পারব সবার সামনে আমার অবস্থা তুলে ধরতে? জানি না। শুধু এটুকু জানি আমি চেষ্টা করব।
আমি আমার মা বাবার একমাত্র সন্তান। ছোটবেলা থেকেই আমি মা বাবাকে কখনো কাছে পাইনি। কারণ তারা দু’জনই ভীষণ ব্যস্ত। তাদের কাছে সন্তানের চেয়েও বড় হল তাদের ক্যারিয়ার। আমার ছেলেবেলা কেটেছে বাসায় বন্দী অবস্থায়। সকাল হলেই মা বাবা তাদের বিশ্বস্ত বুয়ার হাতে আমাকে রেখে তাদের অফিসে চলে যেতেন। সব সময় তাদের কি সব মিটিং থাকত। মাঝে মাঝে থাকত বিভিন্ন পার্টি। তাই তারা ঘরে ফিরতেন অনেক রাতে। সে সময় আমি হারিয়ে যেতাম ঘুমের রাজ্যে। আবার খুব সকালে তারা কাজে চলে যাওয়ায় তাদের সাথে আমার দেখা হত না। এমনকি ছুটির দিনও আমার জন্য তাদের কোন অবসর ছিল না। চার দেয়ালের মাঝে বন্দি হয়ে বড় হতে লাগলাম আমি। সবাই যখন তাদের মা বাবার হাত ধরে স্কুলে যায়, তখন আমি যেতাম আমার বুয়ার হাত ধরে। স্কুল ছুটি হলে সবাই যখন মাকে সারাদিন কি ঘটল তার বর্ণনা দিতে দিতে বাড়ি ফেরে, তখন আমি বুয়ার হাত ধরে চুপচাপ বাড়ি ফিরতাম। আমার স্কুলে প্যারেন্টস্ ডে’তে
অনেক বড় অনুষ্ঠান হত। সবাই তাদের মা বাবাকে নিয়ে আসত। কিন্তু আমি সেদিন স্কুলে যেতাম না। কারণ আমার মা বাবার ব্যস্ততা।
এভাবেই দিন কাটছিল আমার। কিন্তু একদিন ঘটে গেল অন্য এক ঘটনা। রাতে হঠাৎ একটি শব্দে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। দেখি মা বাবা দু’জনই ঝগড়া করছে। ভীষণ সিরিয়াসভাবেই তারা ঝগড়া করছে। কিছু বুঝতে পারলাম না আমি। পরদিন সকালে মা বাবা একসাথে কোথায় যেন গেল। দুপুরে তারা কেউ বাসায় আসল না। সেদিন বিকেলে আমার একমাত্র ফুপী বাসায় এসে আমাকে তার কাছে নিয়ে গেলেন। দেখলাম আমার ফুপীর বাসায় চাচারা অনেকেই আছেন। আমার মনে হল আমাকে দেখে তাদের মন করুণায় ভরে গেল। দাদু আমাকে জড়িয়ে ধরে অনেকণ কাঁদলেন। পরে আমাকে শোনান হল যে, আমার মা বাবা আর কখনো একসাথে থাকবেন না। কারণ তাদের ডিভোর্স হয়ে গিয়েছে। তখন আমার তেমন কোন ফিলিংস হলো না। মনে হলো মা বাবার আদর তো আমি এমনিতেই পাই না। কিন্তু পরে আমাকে নিয়ে তাদের অনেক সমস্যা হলো। আমি কার কাছে থাকব এটা নিয়েই সমস্যা।
এক সপ্তাহ পর আমার মা বাবার সাথে আমার দেখা হলো আদালতে। তারা দু’জনই আমাকে কাছে রাখতে চান। বিচারক যখন আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আমি কার কাছে থাকব তখন আমি কোন উত্তর দিতে পারিনি। কারণ তাদের দু’জনকেই যে আমার ভীষণ প্রয়োজন। কিভাবে যেন আদালতের রায় হলো আমি মায়ের কাছে থাকব। কিছুদিন আমি তার কাছে থাকলাম। প্রায় এক বছর পর আমার নানা নানু তাদের একমাত্র মেয়েকে বিয়ে দেবার সিদ্ধান্ত নেয়। আমি দেখলাম মা কিছুদিন কান্নাকাটি করে পরে রাজি হয়ে যায়। মায়ের নতুন স্বামী মাকে নিয়ে বিদেশ চলে যায়। রেখে যায় আমাকে। এর কিছু দিন পর রোড অ্যাক্সিডেন্টে নানা নানু মারা যায়। এরপর আমি এলাম বাবার কাছে। কিন্তু বাবাও আবার বিয়ে করেছেন। নতুন মা আমাকে তার কাছে রাখতে রাজী নন। পুরোপুরি একা হয়ে যাই আমি।
পরবর্তীতে আমাকে দেখাশোনার দায়িত্ব নেন আমার নিঃসন্তান চাচা চাচী। তারাই এখন আমার বাবা মা। নতুন বাবা মা আমাকে অনেক বেশি আদর করেন। না চাইতেই এখন অনেক কিছু পাই আমি। কিন্তু তারপরও আমার মন খোঁজে অন্য কিছু। কোনদিন যদি আমার সত্যিকার মা বাবা এসে আমাকে জড়িয়ে ধরেন তবেই হয়তো আমি সব কষ্ট ভুলে যেতে পারব। সব কিছু হারাবার পরও আমি এখনও তাদেরকেই খুঁজি। সবসময় খুঁজি।
আমরা সচেতন! আমরা শিক্ষিত!
গ দ্য
আসবাবির রাফসান
আসবাবির রাফসান
পানির পাইপে টপ টপ টপ... শব্দ চলছে তো চলছেই। বাসা অফিস আদালত তো আছেই এমনও দেখা যায় যে, খোদ ওয়াসার গাড়ি চলছে আর এই রাস্তা দিয়ে যে কিছুণ আগে পানিবাহি গাড়ি গিয়েছে তা বোঝানোর জন্য এবং গাড়ি যাতে পথ চিনে ফের ফিরে আসতে পারে সে জন্য রাস্তায় চিহ্ন এঁকে দিয়ে যাচ্ছে। হেতুতে গাড়ির ফিরে আসা হচ্ছে ঠিকই কিন্তু যে জন্য বের হওয়া এবং তার লালন, তা আর পূরণ হচ্ছে না। কত স্থানেই না দেখা যাচ্ছে পানির অহেতুক য় (অপচয় শব্দটা তার ভারিক্কি হারিয়ে ফেলেছে প্রায়)। আমি নিজে যা দেখছি তাতে কি আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টাটা কখনও করে দেখেছি?
বাসার চুলাটা জ্বলছে তো জ্বলছেই, রান্না-বান্না হচ্ছে তো। এই একটু হাতের কাজটা সেরেই ওটাতে হাঁড়ি চড়াবো, ২০ মিনিট না হয় জ্বললই চুলাটা। মিনিটে ...ঘনমিটার গ্যাস পুড়ছে, ২০ মিনিটে হয় ...ঘনমিটার। সিলিন্ডার আকারে কিনলে তার দাম হতো ...টাকা। টাকা দিয়ে কি আর প্রাকৃতিক সম্পদের মূল্য নিরূপিত হতে পারে... তাহলে আর এত কিছু ভেবে কাজ কী। আর যেখানে ঘন্টার পর ঘন্টা বিনা কারণে বা তুচ্ছ কাপড় শুকাতে গ্যাস পোড়ানো হচ্ছে, তারা কি একটু হৃদয় দিয়ে বিচার করবেন না, প্লীজ? দিয়াশলাই বাঁচাবেন? যার এক একটি কাঠির মূল্য মাত্র ৩ পয়সা! এই গ্যাসই না কোনদিন হাজার হাজার কোটি টাকা দিয়ে আমদানি করতে হয় বিধাতায় জানেন!
হায়রে! আমাদের নাকি পানির অভাব, গ্যাস সীমিত। এভাবে ঢাললে আর পোড়ালে পুরো পৃথিবী দিলেও কি এই বাংলাদেশীদের অভাব মিটবে? আমার বাসার পাইপটা একটু নষ্ট হয়েছে- ঠিক করা হয়নি এখনও... হয়ে যাবে। চুলাটা বার বার জ্বালাতে নিভাতে বড় বিরক্ত লাগে তাই জ্বালিয়েই রাখি, ওতে তেমন কি আর তি? আমি তো লেখাপড়া জানা শিতি! সচেতন!! মানুষ!!! দেশের গ্রাজুয়েট নাগরিক!!!
এবার একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে যাই। এক্ষেত্রে ভিন্ন হলেও বর্তমান সময়কার সবচেয়ে জরুরি যন্ত্রটির প্রসঙ্গে বলব, হ্যাঁ, মোবাইল। এর উপকার আমরা প্রতিনিয়তই উপভোগ করছি, আমি ভিন্নতর কিছু অভিজ্ঞতা তুলে ধরব।
এক. কবিতার মন ভালো নেই। এ নিয়ে সে রবিনকে কম করে হলেও ৫০টা ংসং পাঠিয়েছে, রবিন অবশেষে ১টি ব্যাক করেছে- “ÒAmar free sms nai, valo theko” কিন্তু এই sms পড়ে কি আর ভালো থাকা যায়? রনকের সাথে ওর ংসং চালাচালি জমে উঠেছে, গত তিন দিনে ওদের ৬০০ করে sms চালাচালি হয়েছে কিন্তু এখনও ৪৪০০ বাকি। ১৫ দিনের মধ্যেই শেষ করতে হবে, তাই নাওয়া-খাওয়া, পড়া-শুনা, কাস, সবকিছু বাদ দিয়ে ওদের sms চালাচালি চলছে তো চলছেই...
দুই. তানজিলা পড়ছিল, কিছুদিনের মধ্যেই ওর পরীক্ষা... হঠাৎ নিতুর ফোন। পারমিতা-নিতু একসাথেই আছে, মার্কেটে ঘুরতে বেরিয়েছে, ভিন্ন একটা উদ্দেশ্যও আছে। সেই টানে তানজিলা মাকে প্রাইভেটের নাম করে বেরিয়ে গেল। তারা ঘুরছিল-ফিরছিল, কিছু ছেলে তাদের পিছু নিল, তাদের ছবিও উঠিয়ে নিল, এখন অবশ্য এসবে কিছু এসে যায় না, আমরা ভাবি এর বেশি কিছু না হলেই হলো, একদিন সেই বেশি কিছুতেও কিছু এসে যাবে না- আমরা ভাববো, এর বেশি কিছু না হলেই হল...
তাদের অন্য উদ্দেশ্যটি হল আজ পারমিতার ফোনফ্রেন্ড রাব্বি ওর সাথে দেখা করতে আসবে, দু’জনই দু’জনকে দূর থেকে অপরের অলক্ষ্যে দেখে নিয়েছে, পছন্দ হয়েছে, এবার বসল তারা কফি শপে।
জামিল, রোমেল ওরাও রাব্বির সঙ্গে তার ফোনফ্রেন্ড পারমিতা’র সাথে পরিচিত হতে এসেছে। ফ্রি’তে দু’জন যথাক্রমে তানজিলা ও নিতুকে পেয়ে গেল। ওদের তিন জুটি- রাব্বি-পারমিতা, নিতু-রোমেল এবং তানজিলা-জামিল। পারমিতা রাব্বির সাথে কিছুদিন ঘুরলো-ফিরলো, তারপর একসময় অন্য ফোনফ্রেন্ড পেয়ে রাব্বিকে ভূলে গেল, সেও অন্য কাউকে জুটিয়ে নিল। তানজিলা কিন্তু দু’দিন পর ভুলে যাবে তেমন মেয়ে ছিল না- সে জামিলকে পেতে ঘর-বাড়ি সব ছেড়ে ছুড়ে পালিয়ে গেল জামিলের কাছে। জামিল তাকে কাছে টেনে তার সর্বস্ব নিয়ে তাকে মুক্তি দিল। তানজিলা চিরতরে হারিয়ে গেল। নিতু তানজিলার পরিণতি দেখে সাবধান হল। সে রোমেলকে ত্যাগ করতে চাইল। কিন্তু চাইলেই কি হয়? রোমেল তাদের বহু ছবি নেটে ছেড়ে দিল, মোবাইল নাম্বার লিখে দিল বাস, টেম্পু, গণশৌচাগারে। বিরক্তির চূড়ান্ত সীমায় নিতু ঐ সিমখানা বন্ধ করল। কিন্তু রটনা ও ভোগান্তি যা হল আর মানসিক বিড়ম্বনা থেকে সে কি রা পেল?
তিন. জেসান ডাক্তারের চেম্বারে। গান শোনা সেই ছেলেবেলা থেকে। প্রথমে ক্যাসেট প্লেয়ারে ও পরে ভিসিডি প্লেয়ারে শুনত। কিন্তু মোবাইল নেয়ার পর থেকে কানে সারাণ হেডফোন লাগিয়ে গান শোনা (বদ) অভ্যেস হয়ে গিয়েছে। সে জন্যেই তার আজ কানের ডাক্তারের নিকট আগমন। ডাক্তার তার বাবার বন্ধু। তিনবার অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেয়ার পর ফোনেই সেগুলো ক্যানসেল হয়েছে। সে ভাবছে এবারে কান ঠিক করা গেলেই হল। গান-টান ভালভাবে শুনতে পারব। অমুক গানটা সুস্থ কানে ভালভাবে শুনতে হবে।
...এর মানে এই নয় যে, ফোনে আমরা কারো সাথে মোটেই কথা বলব না, বন্ধুত্ব হবে না, কিন্তু সবকিছুতেই একটা নিজস্ব যাচাই-বাছাই, ভাল-মন্দ বিচার বিবেচনা হওয়া উচিৎ। মনে রাখতে হবে মানুষ চেনা বড় দায়। আপনি নিজেই কি নিজেকে পুরোপুরি চেনেন? আপনি নিজেই কি সবসময় আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন? তাহলে অন্যের কাছ থেকে সেই আশা করাটা বোকামি নয় কি?
অনেতিহাসের গল্প
গ ল্প
শাফাক বিন নুর
শাফাক বিন নুর
ঈশ্বরের উপর বিশ্বাসটা আমার বরাবরই নড়বড়ে ছিল। কারণটা জানার চেষ্টাও কোন সময় করিনি। কোন পিছুটান না থাকায় সব কিছু করতাম ইচ্ছে মত। কেউ কখনো একটু ডাক দিয়েও বলেনি, “ওটা করো, এটা করো না।” তাই আস্তে আস্তে সবার প্রতি আমার ঘৃণা বাড়ছিল। তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল আমার হতাশা। নিজেকে অনেকবার প্রশ্ন করেছি। উত্তর পাইনি। পরে বুঝেছি মনের দুয়ার বন্ধ রেখে কোন প্রশ্নের উত্তর পাওয়া আসলেই অসম্ভব। এরপর আরো, আরো ভেবেছি। বুঝেছি ঈশ্বরকে বাদ দিয়ে নিজের অস্তিত্বের আসলেই কোন ভিত্তি থাকে না। শেষ সময়গুলোতে কেন জানি অতীতের এই সব কথাগুলো খুব বেশি মনে পড়ছে। শেষ সময় বলছি কারণ জনমানবহীন, প্রাণহীন কোন মরুপ্রান্তরে পড়ে থাকা নিঃসঙ্গ একজন মানুষ, যে গত চব্বিশ ঘন্টা যাবৎ বাকশক্তিহীন, স্রেফ অনুভূতিশক্তি দিয়ে সে আর কতণ টিকে থাকতে পারবে? যাই হোক, যখন থেকে ঈশ্বরকে বিশ্বাস করেছি, তখন থেকেই মনে জন্ম হয়েছে এক অপার্থিব অনুভূতির। আমি জানি না এর কারণ কি। না, এই অনুভূতিতে সুখ কিংবা দুঃখের কোন ব্যাপার নেই। আছে ভিন্ন কিছু। আচ্ছা, এটা কি ধরণের অনুভূতি? এই অনুভূতির দ্বারা একমাত্র মানুষ ছাড়া আর সবাইকে আমি ছুঁয়ে যেতে পেরেছি। মানুষকে আমি অনুভব করেছি, ভালোবেসেছি। কিন্তু মানুষ আমাকে ভালোবাসেনি, অনুভবও করেনি। সমগ্র মানব জাতির মূল্যায়নের মানদণ্ড যেন অর্থ-পুঁজি, মতা। আচ্ছা, এগুলোই কি জীবনের সবকিছু? জীবন তো এত ুদ্র না। তাহলে কেন জীবন এই সব জাগতিক চলকের হাতে বন্দী? হঠাৎই খেয়াল করলাম, মানুষ ছাড়া সমস্ত দুনিয়াই আমাকে ভালোবেসেছে। কিন্তু খেয়ালটা হলো অনেক পরে। নিজের কাছে নিজে আরো একবার হারলাম। দেখলাম দুনিয়া আমাকে তিরষ্কার না করে বরং কাছেই টেনে নিয়েছে। ভালোবেসেছে। আমাকে তারা কিছু একটা দিতে চেষ্টা করেছে...
ঈশ্বরের ইচ্ছাটা আমার কাছে সবসময়ই বড় বেশি রহস্যময় লেগেছে। তিনি আজ পর্যন্ত আমাকে সঙ্গীহীন, পরিবারহীন রেখেছেন। কেন? কেন তিনি আমাকে এমন এক সমাজের বাসিন্দা করেছেন, যেখানে যন্ত্রের মতো মানুষগুলো একজন আরেকজনকে অনুভব করার, বুঝবার চেষ্টাটাও করে না? ...আচ্ছা, আমিও কি অবচেতন মনে কাউকে অবহেলা করেছি?
জীবনের শুরু থেকে এই মুহূর্ত পর্যন্ত একাকীত্বকে আমি অনুভব করেছি, ঘৃণা করেছি। একাকীত্বের যাতনা আমাকে তিলে তিলে গ্রাস করেছে। আমার সমাজ ব্যবস্থার প্রতিও আমি কখনোই কোন দুর্বলতা অনুভব করিনি। কেনই বা করবো? যে সমাজ মানুষকে স্বাভাবিকতা, মৌলিকতা আর মানবিকতার শিক্ষা দেয় না, সে সমাজের প্রতি আবার কিসের দুর্বলতা? তাই বহুদিন থেকেই জনমানবহীন কোন প্রান্তরে এক মানববসতি পত্তনের অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছি, যে সমাজ হবে আমার একার সৃষ্টি। যেখানে থাকবে না কোন নিষ্ঠুরতা, নির্মমতা। থাকবে সহমর্মিতা আর ভালোবাসা...
যখন থেকে ঈশ্বরকে মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেছি, আমার সকল কাজে তখন থেকেই তাঁর নীরব উপস্থিতির ছোঁয়া পেয়েছি। তবে এগুলোকে কোন সময় ব্যাখ্যা করতে চেষ্টাও করিনি। সমাজের প্রতি আকর্ষণ দিনে দিনে কমতে লাগলো আর সবার থেকে আলাদা হয়ে অন্য কোথাও চলে যাওয়ার আকক্সাও তীব্র হতে লাগলো, যেখানে এই সমাজের কোন কিছুই আমাকে স্পর্শ করবে না। মনের ভেতরে কাদের ডাক শুনতে পেতাম প্রতিনিয়ত, মনে হতো আমার স্বপ্নে দেখা সমাজের বাসিন্দারা আমাকে ডাকছে। এক সময় দরজার বাইরে পা রাখলাম। শুনলাম জানালার ওপাশ থেকে প্রিয় কণ্ঠের সুর বাজছে। আমি হতচকিত, মোহগ্রস্থ হয়ে গেলাম। আর এদিকে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আমার স্বপ্ন। কেন এমন হয়? এক পা ঘরের বাইরে অন্য পা ভেতরে দিয়ে দ্বিধা-বিভক্ত আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। এটাই কি আমার নিয়তি?...আমি বেরিয়ে পড়লাম। পেছনে পড়ে থাকলো সবকিছু...
এখন আমি যেখানটায় আছি, এটি বসবাসের জন্য সম্পূর্ণ অনুপযোগী একটি জায়গা। এই জায়গাকে তার বিপরীত অবস্থায় নেওয়ার জন্য আমি আমার জীবনের সবচাইতে কঠিন পরিশ্রম করেছি। আমি রাতদিন কাজ করি আর অন্যদিকে আমার সমস্ত সঞ্চয় দিনে দিনে কমতে থাকে। এক সময় সমস্ত খাবার, পানি ফুরিয়ে গেলো। ধীরে ধীরে দুর্বল হতে লাগলাম। ুধায় পিপাসায় কাতর আমি এই মরুভূমির কোথাও পাইনি এক ফোটা পানি। ঈশ্বরের দয়া কি আর আসবে না, যেভাবে ধর্মগ্রন্থগুলোতে বর্ণিত হয়েছিল? আমার প্রাথমিক কাজ আমি শেষ করেছি। শুধু দরকার সামান্য বৃষ্টির। জানি আমার এই চাওয়াটা অবান্তর, কিন্তু এটা তো অসম্ভব না। ুধা পিপাসা আর বৃষ্টির অপোয় কাতর আমি যখন বাকশক্তিহীন হলাম, তখন দেখলাম ধুলো-বালিরা আমার মনের কথা শুনছে। তাদের কাছেই বললাম আমার না বলা কথা। এখন হঠাৎ করেই কেমন জানি লাগছে। নিঃশ্বাস নিতে পারছি না। চোখের সামনে সবকিছু ঝাঁপসা হয়ে আসছে। আমি কি মারা যাচ্ছি? নাকি নতুন কোন জীবনে প্রবেশ করছি?
পরিশিষ্ট
হ্যাঁ, তিনি মারা গেছেন। ঈশ্বর এখানেও তাঁর রহস্যময় আচরণকে ধরে রেখেছেন, যে আচরণ বরাবরের মতোই ব্যাখ্যাতীত। মানুষটির মৃত্যুর পরে মরুভূমিতে সৃষ্টি হলো প্রচণ্ড মরুঝড়ের। ধূলো-বালিতে ঢাকা পড়লো তার লাশ। কিছুদিন পরে হঠাৎ প্রচণ্ড বৃষ্টিতে সিক্ত হলো রু মরুভূমির শুষ্ক প্রান্তর। সেই প্রাকৃতিক কবরের উপর জন্মালো মরুভূমির প্রথম গাছ। এরপর আরেকটি, তৃতীয়টি, চতুর্থটি...। কালের পরিক্রমায় মরুভূমিটি রূপান্তরিত হলো বনভূমিতে। সেখানে আশ্রয় নিল নাম না জানা অসংখ্য পাখি। এরপর কোন একদিন এক যাযাবর দল বনভূমির কোল ঘেঁষে বসতি গড়লো।
...আচ্ছা তাদের স্থায়ী বসতিটি কি সেই স্বপ্নদ্রষ্টার স্বপ্নের মতই হয়েছিল? না, এই প্রশ্নের জবাবের কোন দরকার নেই। একজন মানুষের সব স্বপ্ন পূরণ হতেই হবে এমন কোন কথা তো নেই।
ক বি তা
রাফসান গালিব
পরাজিতের গল্প
ছিঁড়তে ছিঁড়তে ছিঁড়েই গেল সুতো
কষ্টগুলো বৃথাই গেলো
চোখ ফেটে জল এলো
উড়তে উড়তে ঘুড়িটা আর উড়লো না তো।
শূন্যে শূন্যে অশূন্যতায়
ইচ্ছাগুলোর ঝগড়া বাঁধায়
অবুঝ বালক রাতদুপুরে
ঢিলটা ছুড়ে মন অদূরে।
পড়তে পড়তে পাতালঘরে
ঢিলটা পীর সুরত ধরে
ডুবায় দেহ নদীর জলে
জড়ায় এ কোন ঊর্ণাজালে!
দেখতে দেখতে দক্ষিণাতে
উড়লো ঘুড়ি মেঘের সাথে
পক্ষী উড়ে ঘুড়ি উড়ে
উড়তে উড়তে অচিনপুরে।
অবুঝ বালক দাঁড়িয়ে থাকে
তেপান্তরের মাঝখানে
বুঝে বুঝে বুঝেনি তো
হারলো সে আজ কোন দানে।
অনুপদ্য -১
অন্ধকারে বীজ বুনো না
ফসল তুলতে হোঁচট খাবে,
বুনতে পারো স্বপ্ন তুমি
জাদুর প্রদীপ নাগাল পাবে!
আদি ঈশ্বর
যুগে যুগে কিংবদন্তীরা
হানা দেয় কালের অন্দরমহলে
কেড়ে নেয় সব নিরবতা
অনেতিহাসের প্রসব বেদনায়
চিৎকার করে অজাত শিশু
ঘুম ভাঙায় কালপুরুষের
আর চন্দ্রগ্রহণে
কপাট খোলে আদি ঈশ্বর।
পানকৌড়ি
দিন শহরে কুমারি হওয়া রাতগুলো
তিন প্রহরে বস্ত্র হারায় পোয়াতিঘরে
আনাড়ি সব ডেলিভারীতে উল্টে থাকা
জোৎস্নাকাল,
পানকৌড়ি হয়,
নষ্ট হওয়া জলটুকু সব পান করে।
অনুপদ্য -২
সরলরেখায় দিলাম দেয়াল
ওপারে থাক
এপারে আমার পা,
বিন্দুটিকে রাখিস খেয়াল।
পরাজিতের গল্প
ছিঁড়তে ছিঁড়তে ছিঁড়েই গেল সুতো
কষ্টগুলো বৃথাই গেলো
চোখ ফেটে জল এলো
উড়তে উড়তে ঘুড়িটা আর উড়লো না তো।
শূন্যে শূন্যে অশূন্যতায়
ইচ্ছাগুলোর ঝগড়া বাঁধায়
অবুঝ বালক রাতদুপুরে
ঢিলটা ছুড়ে মন অদূরে।
পড়তে পড়তে পাতালঘরে
ঢিলটা পীর সুরত ধরে
ডুবায় দেহ নদীর জলে
জড়ায় এ কোন ঊর্ণাজালে!
দেখতে দেখতে দক্ষিণাতে
উড়লো ঘুড়ি মেঘের সাথে
পক্ষী উড়ে ঘুড়ি উড়ে
উড়তে উড়তে অচিনপুরে।
অবুঝ বালক দাঁড়িয়ে থাকে
তেপান্তরের মাঝখানে
বুঝে বুঝে বুঝেনি তো
হারলো সে আজ কোন দানে।
অনুপদ্য -১
অন্ধকারে বীজ বুনো না
ফসল তুলতে হোঁচট খাবে,
বুনতে পারো স্বপ্ন তুমি
জাদুর প্রদীপ নাগাল পাবে!
আদি ঈশ্বর
যুগে যুগে কিংবদন্তীরা
হানা দেয় কালের অন্দরমহলে
কেড়ে নেয় সব নিরবতা
অনেতিহাসের প্রসব বেদনায়
চিৎকার করে অজাত শিশু
ঘুম ভাঙায় কালপুরুষের
আর চন্দ্রগ্রহণে
কপাট খোলে আদি ঈশ্বর।
পানকৌড়ি
দিন শহরে কুমারি হওয়া রাতগুলো
তিন প্রহরে বস্ত্র হারায় পোয়াতিঘরে
আনাড়ি সব ডেলিভারীতে উল্টে থাকা
জোৎস্নাকাল,
পানকৌড়ি হয়,
নষ্ট হওয়া জলটুকু সব পান করে।
অনুপদ্য -২
সরলরেখায় দিলাম দেয়াল
ওপারে থাক
এপারে আমার পা,
বিন্দুটিকে রাখিস খেয়াল।
দি ন লি পি
আসমা সাদেকা
৩১ মে ২০০৯
৩১ মে ২০০৯
আমার মধ্যরাতে ফাঁকা রাস্তা দেখতে খুব ভালো লাগে। রাস্তাটা নির্জন থাকে। ল্যাম্প পোস্টের আলো রাস্তায় পড়ে। জনমানবহীন রাস্তাটা দেখলে অন্য ধরণের অনুভূতি হয়। আজ মধ্যরাতেও আমি রাস্তা দেখার জন্য জানালায় দাঁড়িয়ে ফাঁকা রাস্তা দেখে আনন্দ উপভোগ করছিলাম। হঠাৎ একটা মেয়েকে দেখলাম। মেয়েটা সুন্দর একটা কামিজ পড়া, খুব ঢং করে হাঁটছে আর দেখে মনে হচ্ছে ভাল পরিবারের শিতি কোন মেয়ে। দূর থেকে মেয়েটাকে দেখতে সুন্দরই লাগছিল। পথে হাঁটতে হাঁটতে মেয়েটা ফুটপাথে বসে গেল। আমি অবাক হলাম, ফুটপাথে কেন বসেছে মেয়েটা! তখন রাত ১:৩০ হবে। মেয়েটা সেখানে বসার কয়েক মিনিটের মধ্যেই কিছু লোক এলো তার কাছে। কী যেন বলছে আর মেয়েটি হাত নেড়ে না বলছে। তারপর দু’টি রিক্সাওয়ালা আসল, তাদেরও মেয়েটা হাত নেড়ে না বলল। মনে মনে বুঝতে বাকী রইল না মেয়েটা কোন ধরণের। এরপর আরো ৫-৬ জন ছেলে আসল। তাদের সাথে কথা বলার পর, একটা ছেলে ছিল আর বাকিগুলো চলে গেল। মেয়েটা ছেলেটার হাত ধরে হাঁটা শুরু করল। যা সন্দেহ করেছি, তাই। সে কোন স্বাভাবিক মেয়ে না। কোন ধরণের মেয়ে তা সকলেই বোঝার কথা এতণে। একটা ট্যাক্সি আসল। মেয়েটা আর ছেলেটা সেই ট্যাক্সি করে চলে গেল।
মানুষ জীবন ধারণের জন্য কত ধরণের পথ বেছে নেয়, তা আজ প্রত্য প্রমাণ পেলাম। হয়ত মেয়েটির কোন পথ ছিল না তাই জীবিকা নির্বাহের জন্য তাকে আজ এই পথ বেছে নিতে হল।
জীবনটা অনেক বিচিত্র! রাতে ঘুমাতে কষ্ট হল। একটা গান মনে পড়ছে এখন। হায়রে মানুষ রঙীন ফানুস, দম ফুরাইলে ঠুস্। তবুও ভাই কারোরই নাই একটু খানি হুঁশ। হায়রে মানুষ, রঙীন ফানুস...
১ জুন ২০০৯
আর ভাল লাগছে না। আজ মধ্য রাতে রাস্তা দেখার জন্য দাঁড়ালে মেয়েটাকে আবার দেখি। দেখেই মেজাজটা একদম খারাপ হয়ে গেল। সেদিন যা দেখেছিলাম আজ আরো বেশি খারাপ অবস্থা। আজ মেয়েটাকে নিয়ে ১০-১২ জন ছেলে টানাটানি শুরু করল। সবচেয়ে বেশি মেজাজ খারাপ হল, যখন দেখলাম এই ব্যাপারটা মেয়েটা খুব বহলড়ু করছে। শুনলে হয়ত অবাক লাগতে পারে, যে জায়গায় বিগত দুই দিন ধরে আমি এই অপরাধমূলক কাজটি দেখছি তা হল থানা থেকে ঠিক ২০ গজ সামনে। আমার মেয়েটার জন্য একদম মায়া হলো না। ইচ্ছা করছে যদি পারতাম, মেয়েটাকে গিয়ে বলতাম এভাবে বেঁচে না থেকে আত্মহত্যা কর, অনেক ভাল। আমি যেভাবে দূর থেকে এই কাণ্ড দেখছি, আর কেউ কি দেখছে না? আশে পাশে অনেক ঘরই আছে, ওখানে সিকিউরিটি গার্ড আছে। তারা তামাশা দেখছে। উপর থেকে ঐ মূহুর্তের পরিবেশটা বেশ জঘন্য লাগল। শেষে যা হল তা দেখে আমি আর দাঁড়াতে পারলাম না। তার গায়ের ওড়না একটা ছেলে টেনে নিলো আর একটা ছেলে তাকে কোলে তুলে হাঁটা শুরু করল। বাকি সব ছেলে হৈ হৈ করে মিছিলের মত পিছু পিছু যাচ্ছিল। মনের অজান্তে চোখ দিয়ে দু’ফোটা পানি বের হল। কি হবে আজ রাতটায়? আমি তো ফ্যান ছেড়ে বিছানায় আরাম করে ঘুমাব। ১২টা পশু মিলে আজ কোন নরকের আগুন জ্বালাবে তা শুধু ঐ মেয়েটাই অনুভব করবে। সমাজটা এমন কেন? ক্ষুধা মানুষকে এত নিচে নামাতে পারে! আজ মেয়েটা তার দেহ প্রদর্শন করবে শুধু ুধার তাড়নায়। কেউ কি তাকে সাহায্য করতে পারি না? অন্য পথ কি নেই?
৪ আগস্ট ২০০৯
আজ জনকণ্ঠ পত্রিকাটা পড়ছিলাম। ওখানে বিবি রাসেলের উপর এক পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন ছাপানো হয়েছে। হেড লাইন দেয়া আছে- “আমার সব কাজে ১০০ ভাগ বাংলাদেশ।” তবে পত্রিকায় যে মডেলের ছবি দেয়া ছিল সে পড়া ছিল ওয়েস্টার্ন কাপড়। কাপড়টা তৈরী গামছার। হাতাকাটা হাফ একটা টপস্ এর সাথে গামছার ধুতি পড়া। বিবি রাসেলেরও একটা ছবি আছে। তিনি নিজেও হাতাকাটা একটা ব্লাউজের সাথে খুব ফ্যাশনেবলভাবে গামছার শাড়ি পড়া। ওয়েস্টার্ন কাপড়ে কয়েক টুকরা গামছা লাগালেই বা পুরো কাপড় বাংলাদেশে সেলাই করলেই তা বাংলার সংস্কৃতি হয়ে গেল? তিনি যা লিখেছেন তাতে পুরোটাই ছিল দেশের কথা। পড়ে ভালই লাগলো। তবে তার কথার সাথে পেপারে দেওয়া মডেলের গায়ের পোশাকে কোন মিল খুঁজে পেলাম না। ও ধরণের পোশাক তো বাংলাদেশের সংস্কৃতি নয়। তবে উনি কিভাবে বলতে পারলেন তার কাজে ১০০ ভাগ বাংলাদেশ এবং উনি দেশের সংস্কৃতির জন্য কাজ করেন? তবে তিনি আমাদের গর্ব। তিনি দেশের নামকে আন্তর্জাতিক জগতে অনেক উপরে তুলেছেন। তবে তার কথায় মনে হল যে কোনভাবে গায়ে গামছা জড়ালে বাংলার সংস্কৃতি ফুটে উঠবে। তিনি তার ডিজাইনের মাধ্যমে যেভাবে দেশের সংস্কৃতিকে মানুষের সামনে উপস্থাপন করেছেন বাস্তবে কি কোন মিল আছে? আমার মনে হয় না।
ক বি তা
ফারাহ্ শারমিন ঊর্মি
বন্ধু
মাঝে মাঝে পৃথিবীটা এত বিষন্ন লাগে কেন
বুঝি না।
মনে হয় এখুনি পৃথিবী ছেড়ে চলে যাই
বাঁচতে ইচ্ছে করে না। আবার মাঝে মাঝে
চিৎকার করে বলে উঠি “I want to live.
বিষন্ন মনে যখন বাইরে আকাশের দিকে
তাকাই, তখন আকাশের রঙগুলি দেখি
আকাশ আমাকে কত কথা যে বলে! তা
ভাষায় প্রকাশ করার মত নয়।
তাকাতেই দেয় না, বলে উঠে তুমি আমার
বন্ধু হবে? তখন মনটা পানির মত স্বচ্ছ-সুন্দর
হয়ে যায়। তখন, আর বিষন্ন মন নিয়ে
থাকতে পারি না।
কথা শুনেই আমার আগে আমার আত্মা
হেসে উঠে। তখন বুঝতে পারি
আমি একা নই।
অনেক স্বপ্ন দেখি। যা কাউকে বলা যায় না।
আকাশকে বলা যায়। কারণ সে তো আমার
নড়ংড়স ভৎরবহফ. যখন চাই, তখনই কথা
বলতে পারি।
কষ্ট-সুখ
যদি আমি জানতাম
কষ্টের রঙ নীল
আমি কখনো এ রঙে
নিজেকে রাঙাতাম না।
সুখের রঙ যদি সাদা হতো
তবে আমি শুভ্রতাকে কাছে পেতাম।
কষ্ট-সুখের মাঝে আমি যেন
আজ আর নেই।
কষ্টগুলো যেন আমাকে ঘিরে
আমি তাদের মধ্যমনি।
সুখ যেন আমাকে দেখে ভীত
কোন সাহসই তাদের আমার
কাছে আনতে পারে না।
কষ্টের নীল বর্ণ যেন সাদার
শুভ্রতাকে মুছে দিতে প্রস্তুত
তবে কি সুখ আজ পরাজিত?
না এ হতে পারে না
সুখ আসবে
বিজয়ীর বেশে
আমি তাকে অভিবাদন জানাতে প্রস্তুত।
মৃত্যুহীন স্বপ্ন
সূর্য জাগার আগে জেগে যায় স্বপ্নগুলো
জন্ম নেবার আগে জন্ম নেয়
সারাদিন-সারারাত কত কাজে ব্যস্ত
সময় দিতে পারি না
কিন্তু স্বপ্নগুলো!!!
তারা চলে ভেসে বেড়ায় নীল আকাশে
কান্ত হয় শরীর তবু তারা কান্ত নয়
চলতে থাকে অবিরাম...
ঘুমে চোখের পাতা বন্ধ হয়
বন্ধ হয় না স্বপ্নগুলো
আমি ভুলে যাই, স্বপ্ন আমাকে ভুলে না
ছন্নছাড়া জীবনে আজো স্বপ্ন আমার সাথী
রাত নামে সন্ধ্যা তারারা জ্বলে নিভে যায়
কিন্তু স্বপ্নের বাতিগুলো যেন শক্তি হারায় না
সবকিছুর শেষ দিন আছে
কিন্তু আমার স্বপ্নের নেই
তার শুধু জন্ম হয়, মৃত্যু নেই।
বন্ধু
মাঝে মাঝে পৃথিবীটা এত বিষন্ন লাগে কেন
বুঝি না।
মনে হয় এখুনি পৃথিবী ছেড়ে চলে যাই
বাঁচতে ইচ্ছে করে না। আবার মাঝে মাঝে
চিৎকার করে বলে উঠি “I want to live.
বিষন্ন মনে যখন বাইরে আকাশের দিকে
তাকাই, তখন আকাশের রঙগুলি দেখি
আকাশ আমাকে কত কথা যে বলে! তা
ভাষায় প্রকাশ করার মত নয়।
তাকাতেই দেয় না, বলে উঠে তুমি আমার
বন্ধু হবে? তখন মনটা পানির মত স্বচ্ছ-সুন্দর
হয়ে যায়। তখন, আর বিষন্ন মন নিয়ে
থাকতে পারি না।
কথা শুনেই আমার আগে আমার আত্মা
হেসে উঠে। তখন বুঝতে পারি
আমি একা নই।
অনেক স্বপ্ন দেখি। যা কাউকে বলা যায় না।
আকাশকে বলা যায়। কারণ সে তো আমার
নড়ংড়স ভৎরবহফ. যখন চাই, তখনই কথা
বলতে পারি।
কষ্ট-সুখ
যদি আমি জানতাম
কষ্টের রঙ নীল
আমি কখনো এ রঙে
নিজেকে রাঙাতাম না।
সুখের রঙ যদি সাদা হতো
তবে আমি শুভ্রতাকে কাছে পেতাম।
কষ্ট-সুখের মাঝে আমি যেন
আজ আর নেই।
কষ্টগুলো যেন আমাকে ঘিরে
আমি তাদের মধ্যমনি।
সুখ যেন আমাকে দেখে ভীত
কোন সাহসই তাদের আমার
কাছে আনতে পারে না।
কষ্টের নীল বর্ণ যেন সাদার
শুভ্রতাকে মুছে দিতে প্রস্তুত
তবে কি সুখ আজ পরাজিত?
না এ হতে পারে না
সুখ আসবে
বিজয়ীর বেশে
আমি তাকে অভিবাদন জানাতে প্রস্তুত।
মৃত্যুহীন স্বপ্ন
সূর্য জাগার আগে জেগে যায় স্বপ্নগুলো
জন্ম নেবার আগে জন্ম নেয়
সারাদিন-সারারাত কত কাজে ব্যস্ত
সময় দিতে পারি না
কিন্তু স্বপ্নগুলো!!!
তারা চলে ভেসে বেড়ায় নীল আকাশে
কান্ত হয় শরীর তবু তারা কান্ত নয়
চলতে থাকে অবিরাম...
ঘুমে চোখের পাতা বন্ধ হয়
বন্ধ হয় না স্বপ্নগুলো
আমি ভুলে যাই, স্বপ্ন আমাকে ভুলে না
ছন্নছাড়া জীবনে আজো স্বপ্ন আমার সাথী
রাত নামে সন্ধ্যা তারারা জ্বলে নিভে যায়
কিন্তু স্বপ্নের বাতিগুলো যেন শক্তি হারায় না
সবকিছুর শেষ দিন আছে
কিন্তু আমার স্বপ্নের নেই
তার শুধু জন্ম হয়, মৃত্যু নেই।
অ নু গ দ্য
ইমরান সিফতি
কখনও
কখনও
কখনও নিজেকে খুব একা মনে হয়। মনে হয় যেন কোন কিছুতেই নিজের কোন অস্তিত্ব নেই। নিজের কোন প্রয়োজন নেই। আবার কোন এক সময় এসে উপস্থিত হয় যখন ভাল লাগে। সবকিছুর মধ্যে ভাল লাগা থাকে। সবার সাথে বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে ইচ্ছা হয়। সবাইকে কাছের মনে হয়। তখন নিজেকে মনে করলে, নিজেকে চিন্তা করলে খুব ভাল লাগে।
কিন্তু সবাই কি নিজের হয়? হয় না। কেউ মিশে, কেউ মিশে না। আবার কেউ কেউ কিছুদিন মিশে আস্তে আস্তে দূরে সরে যায়। আমি আমার একলা ঘরে যখন রাত কাটাই, চোখ মেলে যখন বসে থাকি, তখন কেন জানি মনে চিন্তা আসে, কেউ হয়তোবা এসেছিল আমার সাথে মিশতে। আমাকে জানতে। কিন্তু হঠাৎ সে দূরে চলে গেল। আমার আর তাকে জানা হলো না। তাকে চিনতে পারলাম না। মনে হলো নিজেকে ব্যর্থ মানুষ। আসলেই ব্যর্থ।
আমি কার, আমি কার, কে কাহার, কে কাহার, কে জানে? কেউ কি জানে? জানে না। আমি জানি? হয়তোবা জানি। হয়তোবা সে রাত...
পথ
জীবনের কিছুটা সময়, আবার বলতে গেলে অনেকটা পথ পেরিয়ে এলাম। শৈশবের সেই মধুর সময়টা পার হয়ে যাবার পর বাস্তবতার যে দৃশ্য প্রতিনিয়ত দেখছি, তা খুবই ভয়ংকর, বেদনা বিধূর, মর্মান্তিক। কেন? একটা শিশুকেই দেখি। একটা শিশু যে ফুটপাথে হামাগুড়ি দিয়েও বড় হয় আবার বেবী চেয়ারে পরম আদরেও বড় হয়। কিন্তু তারা শিশু। শিশুরা পবিত্র। তবে কেন এ শিশুরাই জর্জরিত? একজন শিশু, যার খাওয়ার কোন অভাব নেই। প্রতিনিয়ত অপচয় হচ্ছে। করছে। কিন্তু তারপরেও পাচ্ছে। কিন্তু আরেকটা শিশু যে একটা ভাতের দানা কুড়িয়ে খাচ্ছে, একটা রুটির জন্য টাকা ভিা চাচ্ছে- যা আমরা প্রতিনিয়ত অবলোকন করছি। কিন্তু না দেখার ভান করে পথ চলছি।
রাস্তায় এক প্রাইভেট ভার্সিটির সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম এক বন্ধুর অপোয়। হঠাৎ দেখলাম একটা শিশু ভার্সিটির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা স্টুডেন্টদের কাছে গিয়ে তার দু’টি ছোট ছোট হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। এখনও সে ভাল করে কথাও বলতে পারে না। তার পাশে দাঁড়ানো বোনের কাছ থেকে দেখেই সে কাজটা করছে। বোনটার বয়সও ৪-৫ বছর। দুঃখের বিষয় হল রাস্তা দিয়ে গাড়িতে চড়ে এক শিশু বার্গার খেয়ে যাচ্ছে আর তার সমবয়সী আরেকটা শিশু হাত পেতে ভিক্ষা করে বেড়াচ্ছে। শুধুমাত্র ক্ষুধার জ্বালায়... কেন এমন হবে?...
মৎস্য-পুরাণ
গ ল্প
ওয়াহিদ সুজন
এক.
ওয়াহিদ সুজন
এক.
আমার জন্ম নদীতে। একদিন চোখ খুলে দেখি, নদীর জলে আমি ভেসে আছি। সাঁতরে তীরে উঠে গেলাম। আমার ভাই বোনেরা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। এছাড়া মৎস্যজীবন শুরুর কোনো স্মৃতি অটুট রইল না।
আমি যখন নদীর তীর ধরে হাঁটি আমার ভাই-বোনেরা নদীর জলে জেগে ওঠে। আমি নদীতে ঝাঁপ দিই। তাদের সাথে সাঁতার কাটি, খেলা করি। জলের জীবনে কোনো কান্তি নাই। কেমন যেন ভরশূন্য অনুভূতি। কখন যে আমার ভাই বোনদের সাথে পাখি হয়ে উঠি আমি নিজেও জানি না। মাঝে মাঝে আমার মাছ মাকে দেখতে ইচ্ছে করে। কিন্তু ওরা বলে নদীই আমার মা। হয়তো কোনো এক ধরনের ঠাট্টা। আমি সেই ঠাট্টা বুঝি না।
একদিন আমার এক ভাইকে মাছরাঙা পাখি তুলে নিয়ে গেলো। অন্যরা পালিয়ে গেলো খুব দ্রুত । আমি চুপচাপ জলে ভাসতে থাকলাম। আমার চোখের জল নদীতে মিশে গেলো। সেখান থেকে একখানা কচুরিপানা তৈরী হলো। আমি তাজ্জব হয়ে ল্য করলাম, সেই পানা’তে কতদ্রুত একখানা সাদা ফুল ফুটল। আমি সেই ফুলের নাম দিলাম দুঃখফুল। এতো চমৎকার ফুলের নাম দুঃখ হয় কী করে?
ততণে আমার অন্য ভাই বোনেরা ফিরে এসেছে। তারা যেন খেলার নতুন সঙ্গী পেলো। ফুলটি খুব সহজে ওদের সাথে মিশে গেলো। এই যে একটু আগে একটা ভয়াবহ ঘটনা ঘটে গেল, তা নিয়ে এদের কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। আমার মন আরো খারাপ হয়ে গেল। গা শিরশির করে উঠল, যদি না বিশাল কোনো পাখি এসে আমাকে টুপ করে তুলে নিয়ে যায়! আর এরা একটু পরেই আমাকে ভুলে যাবে। আমার অভিমান হয়। অচিন অভিমান।
আমি দেখতে পেলাম ফাঁদে পড়া একটা মাছরাঙা। হয়তো সেই মাছরাঙাটাই। সে ফাঁদ থেকে মুক্ত হবার চেষ্টা করছে। আমি তাকে ছেড়ে দিলাম। মাছরাঙাটি আমার ঘাড়ে এসে বসল। আমি তার নাম জিজ্ঞেস করলাম, অমনি পাখিটি উড়ে গেলো।
আমি আর কী করি? তেমন কিছু না। বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াই... আর সেই নদীর তীর ধরে হাঁটি। তার শুরু আর শেষ খুঁজি। কিন্তু উত্তর পাই না। মনে হয় সবকিছুই আমার রূপান্তরের মতো। দিক চিহৃহীন কুয়াশায় মিশে গেছে। অথচ আমি দেখি, আমার আশপাশের মানুষেরা দিব্যি বলে দেয়, তারা সবকিছু জানে। আর আমি শুধু জানি, আমি মানুষের খোলসে আবদ্ধ একখানা মাছ। এইজন্যই কি আমার সীমাবদ্ধতা? আমার মা’ কে এই কথা বললে সে কেমন যেন দুশ্চিন্তায় মুখ থমথমে করে ফেলে।
বাবা বলে, “এটা আর কি? বাচ্চাদের কল্পনা। বড় হলে ঠিক হয়ে যাবে।”
আমি বড় হতে চাই না, কী চমৎকার মৎস্য জীবন!
সুদূর কোনো এক কালে ছিলো এক রাজপুত্র । কী এক অভিশাপে সে ব্যাঙ হয়ে গেলো। যদি কোনো রাজকন্যা তাকে চুমু খায়, তবে সে আবার মনুষ্য জীবন ফিরে পাবে। আমার বাবার মুখে সব’ চে বেশি শোনা গল্প এটি। হয়তো আমার বাবা একটাই গল্প জানতেন।
সারারাত ঘুমোতে পারি না। যেন আমাকে নিয়ে এই গল্প। শুধু উল্টো করে বলা।
বাবাকে বলি, “এটা কি সম্ভব?”
তিনি হেসে বলেন, “রূপকথার জগতে সব সম্ভব। সে জগত তো সত্য নয়। তাই একে মিথ্যে বলা যায়।”
আমি প্রশ্ন করি, “মিথ্যে হলে সে গল্প আসলো কেমন করে? তুমি তো বলো, মিথ্যে বলা ঠিক না। যদি এমন হয় এই জগতটা মিথ্যে আর গল্পটা সত্য?”
বাবা অবাক হয়ে বলেন, “দারুন বলেছিস, জ্ঞানীদের মতো। এটা যদি সত্য হতো, তাহলে তা আমরা বুঝতে পারতাম।”
আমি বুঝতে পারি সেই গল্প মিথ্যে না, কিন্তু এই মনুষ্য জীবনও তো মিথ্যে না। আমি মাছেদের কথা বুঝি, বলতে পারি। অথচ অন্যেরা পারে না।
বাবা বলেন, “যা শুধুমাত্র একজনের জন্য সত্য, অন্যদের কাছে তার মূল্য খুব কম।”
আমি এই কম মূল্যবান সত্য নিয়ে দ্বৈত জীবন যাপন করি। উভচর জীবন।
দুই.
আমি আমার মাছ ভাই বোনদের জিজ্ঞেস করি, তারা কখনো আমাকে কোনো অভিশাপ দিয়েছে কিনা। তারা অভিশাপ বিষয়টা বুঝলোই না। বুঝি তারা আমার চে আলাদা কিছু। আমি আস্তে আস্তে সাঁতার কাটি। আমার পায়ে শ্যাওলা জড়িয়ে যায়।
আমি শ্যাওলাকে প্রশ্ন করি, “কেন এমন হয়?”
সে বলে, “জানি না। আমরা এতটুকু জানি, যা হবার হবে। আমি একখানা শ্যাওলা- হয়তো মাছে খাবে, নয়তো রোদে শুকিয়ে মরবো।”
এতো নির্লিপ্ততা আমার সহ্য হয় না। এরা এতো নির্লিপ্ত কেন? নিজের ভেতর কেমন যেন বিদ্রোহ টের পাই। দুটো জিনিস একইসাথে আমার ভেতর ঘর করে- তা হলো, আমার মনুষ্য সত্তা সকল কিছুতেই তার মহাজনী কায়েম করতে তৎপর। আবার অন্যদিকে ভাষাগত আর ভাবগতভাবে আমি মৎস্য জীবনে প্রবেশ করি কিন্তু আলাদা হয়েও তার অস্তিত্ব জোরালোভাবে কোন কিছু দাবী করে না, তারমধ্যে উদাসীনতা, তন্ময়তা খেলা করে, ধরে নিয়েছি এমন হয়। এরা যে, একই সাথে কথা বলে তা না, বরঙ মনুষ্য সত্তা নিজেকে প্রাণপণে জাহির করতে তৎপর। হয়তো কখনো বা আমি আমার মৎস্য সত্ত্বাকে জোরালো করতে চাই, কিন্তু সে এই বিরোধের ধারনাকে অগ্রাহ্য করে। এখন এই বিষয়টাকে ভ্রম মনে হয়। কেন যেন মনে হয়, মানুষ সবসময় বিরোধ খোজে- তাই সে ছলনার বসত গড়ে। নিজেকে জাহির করতে না পারলে সে ম্বস্থি পায় না।
হঠাৎ হঠাৎ মনে হয়, সবকিছুই ঠিক। জগতের কোনো মানুষ বৃ, কেউ পাখি, কেউ আবার মেঘ। কেউ বুঝতে পারে, আবার কেউ পারে না। আমি বুঝি, এই হলো জনারণ্যে মিশে যাবার ছল। এটা হলেই বা তাতে তো আমার দ্বৈতজীবনের হেরফের হয় না। আমি একবার খেয়ালের বশে বৃরে একখানা ডাল ভাঙ্গতে যাই।
কে যেন আর্তচিৎকার করে বলে, “এই বড়ো অকারণ।”
আমি কেমন যেন ছটফট করি, নিঃশ্বাস নিতে পারি না, সারা শরীর জ্বলতে থাকে। আমি নদীর জলে ঝাঁপিয়ে পড়ি, জ্বালা জুড়োয়।
আমার ভাই-বোনেরা বলে, “এমন করতে হয় না।”
আরো বলে, “নিয়ম ভাঙ্গতে নেই।”
“কী সে নিয়ম?” তারা কোনো উত্তর দেয় না।
আমি নিজের ভেতর কারণ-অকারণের দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ি। ভেতর বাইরে প্রচন্ড কান্তি ভর করে। মায়ের কোলে মাথা রাখি।
মা’কে বলি, “মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দাও।”
মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। আহা, আমি যেন দখিনা হাওয়ার ভেতর সাঁতার কাটছি।
আমি স্বপ্ন দেখি, মৎস্য হয়ে ভেসে যাচ্ছি নদীর শেষ দেখব বলে। আমার পাশাপাশি আমার ভাই বোনেরা। আবার দেখি আমরা দল বেঁধে দখিনা হাওয়ার গান করছি আর উড়ে উড়ে তার উৎস খোঁজ করি। কী যেন একটা গান করি? ওহ, মনে পড়েছে।
“দখিনা হাওয়া, তোর বাড়ি কই। চেয়ে দেখ, জগতের তাবৎ পাখি তোর খোঁজে এসেছি উত্তর হতে, যেখানে মেঘ টইটুম্বর, খেলা করে খালে-বিলে।”
আবার দেখি, অনেক অনেক বৃরে মাঝে আমি একজন।
আমরা বলছি, “হে আমার অশ্র“ বিন্দু যা তুই উড়ে যা। আমার চিঠি পৌঁছে দিয়ে ফিরে আয় আকাশে।” আমাদের অশ্র“ উড়ে উড়ে সুনীল আকাশটাকে মেঘলা করে দেয়। এ যেন বৃরে দল উড়ে গেল আকাশে...
এবঙ
এখন আমি নিজেকে নিবিড় করে আর অনুভব করি না। নদী নামক ধূ ধূ বালু চরে বসে থাকি। কখনো কখনো ডাঙ্গায় তোলা মাছের মতো খাবি খাই। আমার মৎস্য সত্তা দিন দিন নিঃশেষ হয় নিজেতে। কখনো মনে হয় ঘ্রাণ শক্তি কমে গেছে। আগের মতো ফুলের তীব্র সুবাস হৃদয়ে কথা বলে ওঠে না। অনেক রঙ নিজেদের বৈচিত্র্যতা হারিয়ে ফেলেছে। চারপাশে বর্ণহীনতার খেলা।
আমি জেনে গেছি, মনুষ্যজীবনের অভিশাপ- সে ভয়ানক নিঃসঙ্গ। সব থেকেও তার কিছু নাই।
এই বালুচর একদিন ছিল আমার তীর্থ। সেদিন এই বালুচর ছিলো না, এখন বিশ্বাস হতে চায় না। সত্যি, সময় আজব ঘটনা। আর আমার ভাই-বোনদের সাথে শেষ দেখা...
আমি ভুলে যেতে চাই।
অবস্বাদ চেতনাগুলো
ক বি তা
শহিদুল ইসলাম
বিকেল বেলা দেড়শ বছরের পুরনো দালানের ছাদে
পায়চারি করতে করতে
রেলিং ধরে দাড়াঁতেই দেখতে পেলাম লোকটাকে।
আমি ডাকতেই দূরে বহু দূরে রাস্তায় মিলিয়ে গেল,
সাাত পেলাম না।
কিছুদিন পর পাবলিক লাইব্রেরিতে পড়তে গিয়েছিলাম-
টানা চার ঘন্টায় এক ঘেয়েমি চলে এসেছিল,
পঁয়তাল্লিশ মিনিট আনমোনা আনাগোনা ডিসি হিলে-
উদ্দেশ্যহীন চিন্তার উদ্রেক নিয়ে।
হঠাৎ দেখতে পেলাম সেই লোকটাকে, স্বতর্স্ফুত হাসিচ্ছ্বটায়।
পাশের ঝুঁপড়িতে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে দাঁিড়য়ে।
কাছে যেতেই তীহ্ম দৃষ্টি এড়িয়ে, উধাও লোকটি।
বলিভিয়া সরকারের অনুতাপ-মনোতাপ কেমন ছিল জানি না-
চে’কে নয়টি গুলি করে হত্যা করার পর।
পলাশীর যুদ্ধে ফরাসি সৈন্য সিনফ্রের কোন বিষাদ কাজ
করেছিল কিনা জানি না,
মীর জাফরের বিশ্বাস ঘাতকতায়, সিরাজ-উজ-দৌলার প নেওয়াতে।
অস্তিত্বের শিরায় শিরায় কোন অজানা উৎকণ্ঠায়
আমাকে জড়িয়ে ধরেছে জানি না,
অবস্বাদ-বিমর্ষে সুপ্ত চেতনাগুলো গুল্ম থেকে বেড়ে উঠছে না আজ আর।
ইতিহাসের হাজারো পাতায় খুঁজে ফিরি তাকে
অবস্বাদ নেপথ্যের অমলিন হাসিচ্ছ্বটা-
বিনিদ্র কোন রাতে যেমনটি খুঁজে ফিরি সেই লোকটাকে।
যান্ত্রিক জীবনের চেতনার যন্ত্রণা এমনি হয় মনে হয়।
বিবর্ণ-বিমর্ষের সভ্যতায়-
পূর্ণতার প্রতিচ্ছবি ভাস্মর হয় না এই পার্থিবতায়।
শহিদুল ইসলাম
বিকেল বেলা দেড়শ বছরের পুরনো দালানের ছাদে
পায়চারি করতে করতে
রেলিং ধরে দাড়াঁতেই দেখতে পেলাম লোকটাকে।
আমি ডাকতেই দূরে বহু দূরে রাস্তায় মিলিয়ে গেল,
সাাত পেলাম না।
কিছুদিন পর পাবলিক লাইব্রেরিতে পড়তে গিয়েছিলাম-
টানা চার ঘন্টায় এক ঘেয়েমি চলে এসেছিল,
পঁয়তাল্লিশ মিনিট আনমোনা আনাগোনা ডিসি হিলে-
উদ্দেশ্যহীন চিন্তার উদ্রেক নিয়ে।
হঠাৎ দেখতে পেলাম সেই লোকটাকে, স্বতর্স্ফুত হাসিচ্ছ্বটায়।
পাশের ঝুঁপড়িতে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে দাঁিড়য়ে।
কাছে যেতেই তীহ্ম দৃষ্টি এড়িয়ে, উধাও লোকটি।
বলিভিয়া সরকারের অনুতাপ-মনোতাপ কেমন ছিল জানি না-
চে’কে নয়টি গুলি করে হত্যা করার পর।
পলাশীর যুদ্ধে ফরাসি সৈন্য সিনফ্রের কোন বিষাদ কাজ
করেছিল কিনা জানি না,
মীর জাফরের বিশ্বাস ঘাতকতায়, সিরাজ-উজ-দৌলার প নেওয়াতে।
অস্তিত্বের শিরায় শিরায় কোন অজানা উৎকণ্ঠায়
আমাকে জড়িয়ে ধরেছে জানি না,
অবস্বাদ-বিমর্ষে সুপ্ত চেতনাগুলো গুল্ম থেকে বেড়ে উঠছে না আজ আর।
ইতিহাসের হাজারো পাতায় খুঁজে ফিরি তাকে
অবস্বাদ নেপথ্যের অমলিন হাসিচ্ছ্বটা-
বিনিদ্র কোন রাতে যেমনটি খুঁজে ফিরি সেই লোকটাকে।
যান্ত্রিক জীবনের চেতনার যন্ত্রণা এমনি হয় মনে হয়।
বিবর্ণ-বিমর্ষের সভ্যতায়-
পূর্ণতার প্রতিচ্ছবি ভাস্মর হয় না এই পার্থিবতায়।
একান্তের সাড়া
এ কা ঙ্কি কা
শারমিন আকতার জুঁই
শারমিন আকতার জুঁই
হাওয়াঃ কি গো, এভাবে আনমনে অপলকভাবে কী ভাবছো? বুঝতে পেরেছি, হয়তো তুমি আমার মিষ্টি শীতল হিমেল হাওয়া ও তার মন ভোলানো অনুভূতির প্রেমে পড়েছো। তাই না!
পথিকঃ (বিস্ময়ের সাথে বলবে) হ্যাঁ, তাই তো! তোমার সুরভিত স্নিগ্ধ অনুভূতি যেন আমার দেহের প্রতিটি কে আলোড়ন তুলে দিয়েছে। কিন্তু তুমি আমায় দেখা দাও না কেন? ধরো না কেন আমার দু’টো হাত?
হাওয়াঃ (হেসে বলবে) আমায় তুমি হাসালে পথিক। আমি তো হাওয়া, প্রকৃতির ও নিয়তির কাছে বাঁধা। কি করে আমি তোমায় ধরা দেবো?
পথিকঃ কিন্তু আমি তো আমার কল্পনার প্রতিটি সময়ে তোমায় পাবার প্রহর গুণছি। ধরা যদি নাই দিতে পারো, তবে তোমার অদৃশ্য স্নিগ্ধতার মোহে আমায় মুগ্ধ করলে কেন? (আকূলতার সাথে)
হাওয়াঃ তোমার কোন প্রশ্নের জবাব আমি দিতে পারবো না। আমি চললাম... হয়তো আর ফিরে আসবো না। (গম্ভীর গলায়)
পথিকঃ দাঁড়াও, এভাবে কিছু না বলে চলে যেও না... যেও না বলছি...
(শোঁ শোঁ বাতাসের শব্দ হবে।)
দিন যায়, রাত পেরোয়। গ্রীষ্ম, বর্ষা ও শীতের উষ্ণতা পেরিয়ে বসন্ত আসে ধেয়ে। কিন্তু সেই পথিকরূপী মানব আজও সেই অদৃশ্য মানবীর পথ চেয়ে থাকে।
পথিকঃ (আনমনে) বুঝেছি, হয়তো আমারই ভুল হয়েছে। সেই অদৃশ্য মানবীর উপস্থিতি, অনুভূতি সবই আমার কল্পনা ছিল। নতুবা যদি তা সত্যি হতো তবে সে এলো না কেন?
একদিন ঠিক সন্ধ্যার দিকে সুর্য যখন অস্তমিত হতে থাকে, বর্ণিল লাল আভায় যখন আকাশটা ছেয়ে যাচ্ছিল তখনই হঠাৎ কিসের যেন শব্দ হলো। পথিক আজও আনমনে সেই বটবৃরে তলে বসে আছে। কোন কিছুর শব্দই যেন তার কানে লাগেনি। তবুও আচমকা কেন জানি সে এদিক ওদিক ছুটতে থাকে। হঠাৎ সে থমকে দাঁড়ায়।
পথিকঃ তুমি এসেছো! (আকূল ও প্রাণোচ্ছল কণ্ঠে) মনের গভীর কোণে ঠিকই একটি আশার প্রদীপ জ্বলছিল যে তুমি একদিন আসবে। আমার প্রতীা বিফলে যাবে না। তোমায় আমি দেখতে না পেলেও তোমার সেই সুরভিত গন্ধ আজও আমি অনুভব করতে পারি।
হাওয়াঃ কেন, বলো কেন তুমি আমায় এত ভালবাস? তুমি তো আমায় দেখনি, আমায় চেন না তবে কেন তোমার মাঝে আমায় নিয়ে এত হাহাকার...
পথিকঃ (ব্যাঙ্গ হাসি হেসে) কে বলে আমি তোমায় দেখিনি, হতে পারো তুমি অদৃশ্য কিন্তু আমি আমার মনের রঙ তুলিতে আঁকা ছবিতে মনের চোখ দিয়ে তোমায় দেখেছি, তোমায় অনুভব করেছি। আমি তোমার দেহ নয়, তোমার অদৃশ্য আত্মাকে ভালবেসেছি।
হাওয়াঃ (শান্ত গলায়) হয়তো সে কারণেই আমি আবার তোমার কাছে ছুটে এসেছি।
পথিকঃ (আগ্রহের সাথে) তবে কি তুমি আর যাবে না? থাকবে আমার মনের ছোট্ট ঘরে?
হাওয়াঃ হ্যাঁ। তোমার আকূলতা দেখে বিধাতা আজ আমায় মুক্তি দিয়েছেন। মুক্তি দিয়েছেন আমায় অদৃশ্যতা থেকে। এখন তুমি আমায় সত্যিই দেখতে পাবে...
হাওয়া পথিকের সামনে ঘুরে দাঁড়াবে। স্নিগ্ধ মৃদু আলো দু’জনের মুখে পড়বে। দু’জনের চোখে মুখে খুশির আভা দেখা দিবে, চোখ ছলছল করবে।
পথিকঃ বিধাতা আজ আবার বুঝিয়ে দিলেন, মনের আকূল চাওয়া কখনো মিছে হয় না যদি তা সত্যি হয়। মন থেকে যদি কেউ কিছু পাবার আশায় মনের গহীনে আশার আলোর প্রদীপ জ্বালে তবে বিধাতা তা তাকে উপহারস্বরূপ প্রদান করেন। এই হয়তো বিধাতার মহত্ব...
দু’জনের চোখ থাকবে দূর কোন সীমানায়। ধীরে ধীরে মৃদু আলো দূরে মিলিয়ে যাবে...
(পর্দা নামবে)
০০১.
ক বি তা
মঈদ উদ্দীন তৌহিদ
কেউ একজন বলে উঠল, চু-প,
এ-কদ-ম চু-প
কেউ শোরগোল করো না,
দেখতে পাচ্ছো না?
হ্যাঁ আমি দেখতে পেলাম
নিজের প্রতিচ্ছবিগুলোকে বৃত্তাকার পথে
একটি উজ্জ্বল বস্তুকে ঘিরে ধরতে দেখলাম।
বস্তুটির উজ্জ্বল রেখা আকাশ অব্দি চলে গেছে
আর সেটি আমার সত্ত্বার বিচ্ছিন্ন অংশগুলিকে
আকর্ষণ করে টেনে নিয়ে
বিচরণ করা শুরু করল।
আমি দেখতে পাচ্ছি,
স-ব দেখতে পাচ্ছি,
পিপিলিকার মত মানুষ, প্রকৃতির রূপ,
অট্টালিকা... সভ্যতা।
আমি শিহরিত, আনন্দিত, উদ্বেলিত
মনে প্রশ্ন উঁকি দেয়, আমি কি সকল
অভিজ্ঞতা অর্জনের অভিমুখে?
-যা কিছু আনন্দের।
নিজেকে আবার আবিষ্কার করলাম
এবার আর প্রতিচ্ছবি নয়
নিরেট অন্ধকারে নিরেট আমি একাকী-
এ কী! এ কার মধ্যে এসে পড়লাম?
অন্ধকার, দুর্গন্ধ- আমাকে ঘিরে
কিলবিল করছে কি যেন।
পোকামাকড়! মাটি কই? পা কোথায়?
বাঁচাও! প্রভু, আমাকে বাঁচাও!
মঈদ উদ্দীন তৌহিদ
কেউ একজন বলে উঠল, চু-প,
এ-কদ-ম চু-প
কেউ শোরগোল করো না,
দেখতে পাচ্ছো না?
হ্যাঁ আমি দেখতে পেলাম
নিজের প্রতিচ্ছবিগুলোকে বৃত্তাকার পথে
একটি উজ্জ্বল বস্তুকে ঘিরে ধরতে দেখলাম।
বস্তুটির উজ্জ্বল রেখা আকাশ অব্দি চলে গেছে
আর সেটি আমার সত্ত্বার বিচ্ছিন্ন অংশগুলিকে
আকর্ষণ করে টেনে নিয়ে
বিচরণ করা শুরু করল।
আমি দেখতে পাচ্ছি,
স-ব দেখতে পাচ্ছি,
পিপিলিকার মত মানুষ, প্রকৃতির রূপ,
অট্টালিকা... সভ্যতা।
আমি শিহরিত, আনন্দিত, উদ্বেলিত
মনে প্রশ্ন উঁকি দেয়, আমি কি সকল
অভিজ্ঞতা অর্জনের অভিমুখে?
-যা কিছু আনন্দের।
নিজেকে আবার আবিষ্কার করলাম
এবার আর প্রতিচ্ছবি নয়
নিরেট অন্ধকারে নিরেট আমি একাকী-
এ কী! এ কার মধ্যে এসে পড়লাম?
অন্ধকার, দুর্গন্ধ- আমাকে ঘিরে
কিলবিল করছে কি যেন।
পোকামাকড়! মাটি কই? পা কোথায়?
বাঁচাও! প্রভু, আমাকে বাঁচাও!
ভালবাসার স্পর্শ
গ ল্প
আসমা সাদেকা
আসমা সাদেকা
মা মারা গেলে বিষয়টা স্বাভাবিকভাবে নিতে পারছিলাম না কিছুতেই। নিজেকে বেশ একা মনে হচ্ছিল। খুব অল্প বয়সে মাকে হারিয়ে আমি অসহায় বোধ করলাম। আমার এই বিষণœতা বাবাকে ভীষণ কষ্ট দেয়। বাবা আবার বিয়ে করেন। নতুন মাকে দেখে মনে হল আমি যেন মাকে ফিরে পেয়েছি আবার। মায়ের প্রতি ভালবাসার কমতি ছিল না আমার। তবে কখনো বুঝার বা ভাবার চেষ্টা করিনি মা আমাকে ভালবাসে কি না। ধীরে ধীরে সংসার বড় হল। বুঝতে পারি আমাকে সকলের বোঝা মনে হচ্ছে। মায়ের ভালবাসার মধ্যে কৃত্রিমতা আমি উপলব্ধি করতে থাকি। আমি তাদের যতই কাছের মনে করি না কেন আমাকে তারা আপনভাবে দেখেনি কখনো। মাকে ভালবেসেছি প্রচুর। আর ভাই বোনেরা ছিল আমার এক একটা অঙ্গ। কিন্তু আমাকে তারা আপন করে নেয়নি কখনো তা বুঝতেই পারলাম না কিছুতেই। তাদের ভালবেসে এতই অন্ধ হলাম আমার প্রতি তাদের হীনতা, অবজ্ঞার ভেতরেও আমি ভালবাসা খুঁজে পেতাম। মায়ের আসল রূপ ধরা পড়ে বাবা মারা যাওয়ার পর। তখন বোঝার বয়স আমার হয়েছে। পরিবারের নগন্য সদস্য ছিলাম আমি। মায়ের ঘৃণা, ভাই বোনের তিরষ্কার আমাকে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে দিল। ফেলে আসা অতীতগুলো সব স্বপ্ন মনে হলো। সম্পত্তির লোভ মাকে এতই পেয়ে বসেছিল যে, আমার ভালবাসা তাদের ছলনা মনে হল। আমাকে এই আশ্রমে রেখে চলে গেল সবাই। আমি নিস্তব্ধ দাঁড়িয়ে ছিলাম। মা একবারও ফিরে তাকালো না পেছনে। এত ঘৃণা আমার প্রতি মায়ের? নিজেকে প্রশ্ন করলাম। সব জেনেও মাকে ঘৃণা করতে পারছিলাম না কিছুতেই। কেন জানি না, উল্টো মায়ের প্রতি ভালবাসা ও তাকে কাছে পাওয়ার আশা দিন দিন বেড়েই চলছিল।
এভাবে আশ্রমে কেটে গেল ১৬টি বছর। এই ১৬ বছরে প্রতিদিনই আমি গেটের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। ভাবতাম মা আসবে। একটু হয়তো দেরী হচ্ছে। কিন্তু আসবে। মায়ের দেখা মিলেনি একবারও। তবে আশা আমি ছাড়িনি। বয়স এখন ৩৭-এর কোঠায়। একটি এনজিওতে চাকরি করছি। বিয়ে করিনি কারণ তেমন ইচ্ছে আমার ছিল না কখনোই। রানু ও প্রাপ্তির বিয়ে হয়েছে। রানুর দু’টি ছেলে। সবুজ লন্ডনে থাকে। পড়াশুনাও করেছে ওখানে। শুনে খুব ভাল লাগল। মায়ের আশা পূরণ হয়েছে। তার সন্তানেরা মানুষের মত মানুষ হয়েছে। রাজীব আমার বন্ধু। সে আবার প্রাপ্তির শশুড়বাড়ীর আত্মীয়। তার থেকে যত সব খবর পাওয়া। রাজীব বহু কষ্টে মায়ের ঠিকানাটা আমাকে এনে দিয়েছিল। ঠিকানাটা হাতে পাওয়ার পর মাকে আর দেখতে ইচ্ছে হচ্ছিল না। তবে আমিই অনেক কষ্টে রাজীবকে ঠিকানাটা এনে দিতে রাজি করিয়েছি। কিন্তু ঠিকানাটা পড়েই দেখিনি। হাতে কাগজটা নিয়েই ছিঁড়ে ফেলে দিলাম। এত বছরে এই প্রথম মাকে ঘৃণা হচ্ছে। “মা, একবারও কি আমার কথা মনে পড়লো না তোমার? হয়তো আমাকে তুমি জন্ম দাওনি তবে তোমাকে আমি মা বলে ডেকেছি। তোমাকে কাছে পাওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত আমার জন্মদাত্রী মায়ের কথা একবারও মনে পড়েনি। যতবারই মা’র কথা চিন্তা করেছি, শুধু তোমাকেই সামনে দেখেছি। আর শুধু তোমার জন্য দু’চোখ জলে ভাসিয়েছি।” রাজীবের সামনে যখন এসব কথা বলছিলাম, তখন দেখি সে কাঁদছিল তবে আমার মোটেও কষ্ট হচ্ছিল না। আসলে আমার কিছুই অনুভব হচ্ছিল না। শুধু বাবাকে মনে পড়ছিল। আজ যদি বাবা থাকত তবে হয়তো আমার জীবনটা এমন হতো না। আমার চারপাশে আপন বলতে কেউ ছিল না। বন্ধু হিসেবে হাত বাড়িয়েছিল রাজীব। জীবনে এই একটাই ভাল বন্ধু পেয়েছি। তার বৌটাও বেশ ভাল ছিল, নাম নীলা। আমাকে বড় বোনের মত শ্রদ্ধা করত। রাজীব ও নীলার বিয়ের পরপরই বন্ধুত্বের গভীরতা অনেকাংশে কমে গিয়েছিল। তখন দেখা হত হঠাৎ। আমি মাঝখানে ভীষণ বিষন্নতায় ভুগছিলাম। নিজের বেঁচে থাকার কোন কারণ বা ল্য খুঁজে পাচ্ছিলাম না, তাই নিজের অস্তিত্বকে মিটিয়ে দেব ভেবেছিলাম। কিন্তু তখনই আমার কাছে আসে অর্পিতা, রাজীব আর নীলার মেয়ে। অর্পিতার যখন ৩ বছর বয়স, রাজীব ও নীলা কার অ্যাক্সিডেন্টে মারা যায়। নীলা মৃত্যুর আগে অর্পিতাকে আমার হাতে তুলে দেয়। সেই থেকে নতুন জীবন আমার। আমি মা হয়েছি। পৃথিবীতে বেঁচে থাকার এক নতুন উদ্যম খুঁজে পেলাম। মা ও মেয়ের সুখের সংসার। আজ অর্পিতার জন্মদিন। ওর বয়স এখন ১২। ঠিক করেছি তাকে আজ বলব তার আসল মা বাবার কথা। কিভাবে নেবে সে, তা জানি না। তবে আমার বিশ্বাস আমার ভালবাসা তাকে আমার কাছ থেকে কখনোই দূরে নিতে পারবে না। বরং আমার আরো অনেক কাছে টেনে আনবে। তবে আবার ভয় হয়, আমাকে সে ভুল বুঝবে না তো? “অর্পিতা, মা হারানোর কষ্ট আমি সহ্য করতে পেরেছি তবে সন্তান হারানোর কষ্ট আমি সহ্য করতে পারব না। জন্ম হয়তো আমি তোমাকে দেইনি। তবে ভালবাসায় বিন্দুমাত্র কৃত্রিমতা আমার না ছিল, না আছে, না থাকবে। আজ তোমার জন্মদিনে তোমাকে সব জানাবো। উপহার হিসেবে দেব তোমার মা আর বাবার ছবি। আর ১ ঘন্টা পরে তুমি ঘুম থেকে উঠবে। আমি সে সময়ের অপোয়, কখন তুমি উঠবে আর তোমাকে জড়িয়ে ধরব। আজকের সকালটা কেমন হবে কে জানে? আজ কি আকাশ কালো মেঘে ঢেকে যাবে নাকি সোনালী রোদে চারপাশ আলোকিত হয়ে উঠবে? আজ প্রকৃতিও তোমার অপোয়। সে সাজবে তোমার রঙে। তোমার প্রতিটা ণ যেন শুভ হয় আর ভোরের আলোর মত স্নিগ্ধ থাকে সেই প্রচেষ্টায় থাকব সারা জীবন। “শুভ জন্মদিন মেয়ে”।
ত্যাগকাব্য ভালোবাসায়
নি বে দি ত ক বি তা
ত্যাগকাব্য ভালোবাসায়
আমরা শুধু পারি কবিতা উৎসর্গ করতে আর তিনি নিজ ভূমির জন্য উৎসর্গ করেছিলেন নিজেকে
... ...ধন্য তুমি মাহমুদ দারবিশ
রাফসান গালিব
শনিবারে পুঁতে রাখা মাইনের আঘাতে নিহত হয় জন্মদাত্রী মাতা
রবিবারে কামানের গোলায় পঙ্গু হয়ে যায় প্রিয় সন্তান
সোমবারে গুলির ছিটায় অন্ধত্ব বরণ করে জন্মদাতা পিতা
মঙ্গলবারে ধর্ষিতা হবার উদ্দেশ্যে অপহৃত হয় নিষ্পাপ বোন
বুধবারে শান্তিভঙ্গের অভিযোগে অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার হয় অপ্রাপ্তবয়স্ক ভাই
বৃহস্পতিবারে বোমার আঘাতে হাসপাতাল ধ্বসে নিহত হয় গর্ভবতী প্রিয়তমা স্ত্রী
আর জুমাবারে সে একটি স্ক্র্যাচ হাতে বেরিয়ে পরে তোমার উদ্দেশ্যে
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহস্পতিবারের সকল দুঃখ কষ্ট কান্নাকে
খালি ঘরে বাতাসের সাথে তালা দিয়ে।
মিহরাবের উপর দাঁড়ানো তোমার ধবধবে সাদা
পাঞ্জাবীর অবয়বে সে তার স্বপ্নের পতাকা দেখতে পায়
রঙতুলির খাতায় প্রিয় সন্তানের আঁকা মানচিত্রে দেখতে পায়
তোমার পবিত্র চাদরের শুভ্রতায়
তোমার কণ্ঠে শুনতে পায় বোনের গাওয়া জাতীয় সংগীত
কবিতার লাইনে লাইনে তারপর নিঃশ্বাসের বিরতির মুহুর্তটাতে
ফিরে আসে জন্মদাতার মৃদু আশীর্বাদ
প্রিয়তমা স্ত্রী আর অনাগত সন্তানের হাস্যোজ্জ্বল চেহারা খুঁজে পায়
কাব্যভাষণের প্রতিটি শব্দ ও অরে
এভাবেই তোমার প্রতিটি অর শব্দ বাক্য আর ছন্দে
গড়ে উঠে একজন দেশপ্রেমিকের স্বাধীনতার স্বপ্ন
খুঁজে ফেরে তার
জন্মদাতা-দাত্রী
ভাই-বোন
অনাগত সন্তান
প্রিয়তমা স্ত্রীকে
এখন আর তোমায় দেখতে পায় না কেউ
তোমার কবিতা শুনতে পায় না, শুনতে পায় না কাব্যভাষণ
মেহরাব থেকে ভেসে আসে না গোলাপের সুবাতাসও
আলোর পাখায় ভর করে জোনাকী হয়ে উড়ে গেছ আলোর দেশে
আর এক খণ্ড জোৎøা ফেলে গেছ মেহরাবের সেই শূন্য জায়গাটায়
প্রতি সপ্তাহে জুমাবারে আছরের পর এখনো সবাই ভীড় করে
সেই মিহরাবের নীচটায় আর উপরের দিকে তাকিয়ে থাকে
তোমায় দেখবে বলে কাব্যভাষণ শুনবে বলে
প্রিয় মানুষের অনুপস্থিতিতে মিহরাবের পাশে
দাঁড়িয়ে থাকা লম্বা জলপাই গাছটার দুলুনিতে
ভেসে আসে তোমার কবিতা, কাব্য সংগীতে
মৃদুভাবে নড়ে উঠে জানালার খোলা কপাট
তারপর মিহরাবের কারুকার্যপূর্ণ দেয়ালখানিতে
আকষ্মিক দিনের আলোয় নেমে আসে
এক খণ্ড জোৎøার অলৌকিক প্রজেক্টর
যার মধ্যে তোমাকে দেখে আবেগে আপ্লুত
হয়ে পড়ে সবাই আর অশ্র“ সংবরণ করে
তেজোদ্দীপ্ত কণ্ঠে একযোগে উচ্চারিত করে
স্বাধীনতার ঘোষণা...
ফিরে যাওয়ার আগ মুহুর্তে কেউ একজন প্রতিবারই
খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে
বলে উঠে, “হে মালিক! তুমি আমাদের কবিকে গ্রহণ করো”
সেই সাথে সবার কণ্ঠ পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তর ছুঁয়ে
প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে তিনবার
আমিন আমিন আমিন!!!
ত্যাগকাব্য ভালোবাসায়
আমরা শুধু পারি কবিতা উৎসর্গ করতে আর তিনি নিজ ভূমির জন্য উৎসর্গ করেছিলেন নিজেকে
... ...ধন্য তুমি মাহমুদ দারবিশ
রাফসান গালিব
শনিবারে পুঁতে রাখা মাইনের আঘাতে নিহত হয় জন্মদাত্রী মাতা
রবিবারে কামানের গোলায় পঙ্গু হয়ে যায় প্রিয় সন্তান
সোমবারে গুলির ছিটায় অন্ধত্ব বরণ করে জন্মদাতা পিতা
মঙ্গলবারে ধর্ষিতা হবার উদ্দেশ্যে অপহৃত হয় নিষ্পাপ বোন
বুধবারে শান্তিভঙ্গের অভিযোগে অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার হয় অপ্রাপ্তবয়স্ক ভাই
বৃহস্পতিবারে বোমার আঘাতে হাসপাতাল ধ্বসে নিহত হয় গর্ভবতী প্রিয়তমা স্ত্রী
আর জুমাবারে সে একটি স্ক্র্যাচ হাতে বেরিয়ে পরে তোমার উদ্দেশ্যে
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহস্পতিবারের সকল দুঃখ কষ্ট কান্নাকে
খালি ঘরে বাতাসের সাথে তালা দিয়ে।
মিহরাবের উপর দাঁড়ানো তোমার ধবধবে সাদা
পাঞ্জাবীর অবয়বে সে তার স্বপ্নের পতাকা দেখতে পায়
রঙতুলির খাতায় প্রিয় সন্তানের আঁকা মানচিত্রে দেখতে পায়
তোমার পবিত্র চাদরের শুভ্রতায়
তোমার কণ্ঠে শুনতে পায় বোনের গাওয়া জাতীয় সংগীত
কবিতার লাইনে লাইনে তারপর নিঃশ্বাসের বিরতির মুহুর্তটাতে
ফিরে আসে জন্মদাতার মৃদু আশীর্বাদ
প্রিয়তমা স্ত্রী আর অনাগত সন্তানের হাস্যোজ্জ্বল চেহারা খুঁজে পায়
কাব্যভাষণের প্রতিটি শব্দ ও অরে
এভাবেই তোমার প্রতিটি অর শব্দ বাক্য আর ছন্দে
গড়ে উঠে একজন দেশপ্রেমিকের স্বাধীনতার স্বপ্ন
খুঁজে ফেরে তার
জন্মদাতা-দাত্রী
ভাই-বোন
অনাগত সন্তান
প্রিয়তমা স্ত্রীকে
এখন আর তোমায় দেখতে পায় না কেউ
তোমার কবিতা শুনতে পায় না, শুনতে পায় না কাব্যভাষণ
মেহরাব থেকে ভেসে আসে না গোলাপের সুবাতাসও
আলোর পাখায় ভর করে জোনাকী হয়ে উড়ে গেছ আলোর দেশে
আর এক খণ্ড জোৎøা ফেলে গেছ মেহরাবের সেই শূন্য জায়গাটায়
প্রতি সপ্তাহে জুমাবারে আছরের পর এখনো সবাই ভীড় করে
সেই মিহরাবের নীচটায় আর উপরের দিকে তাকিয়ে থাকে
তোমায় দেখবে বলে কাব্যভাষণ শুনবে বলে
প্রিয় মানুষের অনুপস্থিতিতে মিহরাবের পাশে
দাঁড়িয়ে থাকা লম্বা জলপাই গাছটার দুলুনিতে
ভেসে আসে তোমার কবিতা, কাব্য সংগীতে
মৃদুভাবে নড়ে উঠে জানালার খোলা কপাট
তারপর মিহরাবের কারুকার্যপূর্ণ দেয়ালখানিতে
আকষ্মিক দিনের আলোয় নেমে আসে
এক খণ্ড জোৎøার অলৌকিক প্রজেক্টর
যার মধ্যে তোমাকে দেখে আবেগে আপ্লুত
হয়ে পড়ে সবাই আর অশ্র“ সংবরণ করে
তেজোদ্দীপ্ত কণ্ঠে একযোগে উচ্চারিত করে
স্বাধীনতার ঘোষণা...
ফিরে যাওয়ার আগ মুহুর্তে কেউ একজন প্রতিবারই
খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে
বলে উঠে, “হে মালিক! তুমি আমাদের কবিকে গ্রহণ করো”
সেই সাথে সবার কণ্ঠ পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তর ছুঁয়ে
প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে তিনবার
আমিন আমিন আমিন!!!
তোমার রূপকথার গল্পগুলো
গ ল্প
মাসউদুর রহমান
পথ
মাসউদুর রহমান
পথ
দীর্ঘ এক পথ, যোজন যোজন লম্বা। অনতিক্রম্য মহাদৈর্ঘের এ পথ। পথের দু’দিকের দু’টি শেষ বিন্দুতে দু’জন ব্যক্তি দাঁড়িয়ে- আমি আর তুমি। দূরত্ব এত যে, কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। কিন্তু আমরা একে অপরকে অনুভব করতে পারছি। তাই আমি যখন এক কদম হেঁটে সামনে গেলাম, আমি বুঝতে পারলাম আমাদের দূরত্ব দু’কদম কমে গেছে। হঠাৎ মনে হলো, এভাবে পথ কি কখনো শেষ হবে, না আমরা কেউ কাউকে দেখতে না পাওয়ার বেদনা নিয়ে মাঝ পথে মাটিতে মিশে যাবো? আমি জানি, তুমিও তাই ভাবছো। অনতিক্রম্য এই দূরত্ব আমাকে এবং তোমাকেও দ্বিধান্বিত এবং হতাশাগ্রস্থ করে তুলছে। কিন্তু আমরা তো পরস্পরকে ভালোবাসি। কেউ কাউকে পাই আর না পাই, দেখি আর না দেখি, তাতে কী? আমাদের ভালোবাসা আমাদের ব্যাথা উপশম করবে, আমাদের না পাওয়াকে পুষিয়ে দেবে, অ-দেখাকে মানিয়ে নেবে। তুমিও নিশ্চই এভাবেই ভাবছো আর এ-ও ভাবছো যে ফিরে যাবে, কারণ আমিও যে ফিরে যাবার কথা ভাবছি।
ভাবতে ভাবতে মনের কোণে এক টুকরো বেদনা নিয়ে ঘুরে দাঁড়ালাম। আমার সামনে মাটিতে এক জোড়া পা দেখতে পেলাম। দৃষ্টিটা ক্রমান্বয়ে উপরের দিকে তুলতে তুলতে এক জোড়া হাত, একটা শরীর আবিষ্কার করলাম আমার সামনে। দেখলাম আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছো তুমি এবং আমিও তোমার দিকে।
কী আশ্চর্য! পৃথিবীটা যে গোল সেটা আমরা ভুলেই গিয়েছিলাম!
আজ্ঞাবাহী
নারী ও পুরুষের প্রেমের মাধ্যমে আমার জন্ম হয়নি, আমার জন্ম ঈশ্বরের হাতে, অনেকটা আদমের সৃষ্টির মতো। তবে আমাকে সৃষ্টির প্রতিটি প্রক্রিয়ার শেষেই ঈশ্বর আমাকে একবার করে জিজ্ঞেস করতেন, “ভেবে দেখো, জন্মাবে কিনা, তুমি যদি না চাও, তবে তোমার জন্ম প্রক্রিয়া এখানেই বন্ধ করে দিই।” আমার সর্বদা একটাই উত্তর ছিল, “না, আমি জন্মাতে চাই।” এভাবে এক বিন্দু জমাট রক্ত থেকে এক টুকরা মাংস, মাংসের ভেতরে হাড়-গোড়, ধীরে ধীরে হাত-পা এবং এক সময় এই পূর্ণ ‘আমি’টার জন্ম হয়। জন্মাবার পর ঈশ্বর আমাকে তোমার কাছে পাঠালেন, তোমার অধীন করে। আমার ভাগ্যলিপিতে ঈশ্বর এটাই লিখে দিয়েছিলেন। এখন তোমার ইচ্ছাই আমার ইচ্ছা। আমার মুখ দিয়ে এখন যে কথা বেরোয়, তা আসলে তোমার কথা। আমার নিজের কোন দাবী নেই, তোমার যেটা দাবী সেটা আমারও। তুমি গাইতে বললে আমি গাই। তুমি যখন হাসো, তোমাকে খুশি করার জন্য আমিও হাসি, কারণ তোমার খুশিতে যে আমাকেও খুশি হতে হয়। আমার নিজের কোন চাওয়া-পাওয়া নেই, দিন-রাত নেই, স্বপ্ন নেই, বাস্তবতা নেই, তোমার যা আজ্ঞা, তা-ই আমার আজ্ঞা। তোমার থাকলে আমার আছে, তোমার না থাকলে আমারও নেই। ঈশ্বর আমার ভাগ্য খাতায় এটাই লিখে রেখেছেন। তুমিও আমার উপর প্রচণ্ড খুশি। এরকম পরম আজ্ঞাবাহী কি আর পাওয়া যায়!
জানি না তুমি খুশি হয়ে ঈশ্বরকে কখনো ধন্যবাদ দিয়েছো কি না। যদি না দিয়ে থাকো, তবে ভালো করেছো। কারণ ঈশ্বর আমার কপালে আরো একটা কাজ নির্ধারণ করে রেখেছেনÑ আমার হাতে তোমার মৃত্যু।
গল্প
ধরো, আমরা দু’জন সামনা সামনি বসে আছি, গল্প করবো। ঠিক হলো, আজ তুমি গল্প করবে আর আমি শুনবো। আবার ধরো, আমি অন্যকোন একদিন তোমাকে গল্প শুনিয়েছিলাম, তাই আজ তোমার পালা। তুমি শুরু করলে তোমার গল্প, বললে, “ভাবো,” আমি বললাম, “কি ভাববো?” তুমি বললে, “ভাবো, একটা সিংহের খাচা একপাশে আর একটা বাঘের খাচা অন্যপাশে। মাঝখানের শূন্য জায়গাটাতে তুমি।” আমি খুব আগ্রহে কান পাতলাম। আমার আগ্রহ দেখে তুমি ভাব নিলে, “থাক, এটা আজ আর না বলি।” “কেন? আজই বলতে হবে,” আমি প্রতিবাদ করলাম। “ঠিক আছে, ঠিক আছে, শোন।” তুমি মৃদু হাসলে। ফের শুরু করলে, “তোমাকে আমি বললাম, বাঘ কিংবা সিংহ যে কোন একটা খাচায় তোমাকে প্রবেশ করতে হবে। তুমি কোনটাতে যাবে?” তুমি আমাকে প্রশ্ন করলে। ক্ষুধার্ত বাঘ, ক্ষুধার্ত সিংহ, একই কথা। তুমি যেটাতে ফেলতে চাও।” আমি হেসে উত্তর দিলাম। তুমি কিছুটা গম্ভীর হয়ে বললে, “বাঘের খাচায়। কিন্তু সেখানে পাঠানোর আগে আমার সঙ্গীরা তোমার হাত-পা বেঁধে ফেলবে। তারপর তোমাকে সেখানে নিপে করবে।” আমি হাসলাম, বললাম, “বেশ।” তোমার গলা খাদে নামিয়ে, কণ্ঠে আরো বেশি গভীরতা এনে, চেহারায় আরো বেশি কাঠিন্য এনে, তুমি আমার খুব কাছে মুখ নিয়ে এসে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলে, “তোমাকে একটা প্রশ্ন করবো?” “করো।” আমি বড় বড় চোখে বললাম। তুমি শুরু করলে, “আমি তোমাকে দু’টি পছন্দ দেবো, এক, বাঘের খাচায় গিয়ে আপোষে তুমি বাঘের খাদ্য হয়ে যাবে, দুই, হাত-পা বাঁধা অবস্থায় তুমি বাঘের সাথে লড়াই করবে।” তোমার গলার স্বর অদ্ভুতভাবে কাঁপছিল। আমি স্থির দৃষ্টিতে তোমার দিকে তাকালাম। তুমি দু’চোখ বন্ধ করে ফেললে, মনে হয় আমার উত্তর শুনতে ভয় পাচ্ছো। “আমি বাঘের সাথে লড়াই করবো, হাত-পা বাঁধা অবস্থায়।” তোমার বন্ধ করা চোখ দু’টির দিকে তাকিয়ে আমি বললাম। একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়তে ছাড়তে তুমি চোখ খুললে। উঠে দাঁড়ালে এবং ফিরে গেলে। পেছন ফিরে বলে গেলে, “কোন বোকা লোকের সাথে আমার বন্ধুত্ব থাকতে পারে না।”
কাঙ্খার পাপে
ওদের দু’জনেরই বয়স ৩০। কিন্তু তাদের একজন বিবাহিত, অন্যজন অবিবাহিত। দুইজনই গেল ঈশ্বরের কাছে, একটা প্রার্থনা করতে। প্রথমে গেলো অবিবাহিতজন। ঈশ্বর জানতে চাইলেন, “তোমার কী আবেদন পেশ করো।” অবিবাহিত বললো, “পৃথিবীর সবচে’ সুন্দরী কুমারীটি আমাকে দিন।” “তাকে তোমার কী প্রয়োজন?” ঈশ্বর প্রশ্ন করলেন। অবিবাহিত উত্তর দিলো, “এ আমার সারা জীবনের স্বপ্ন।” ঈশ্বর বিরক্ত হলেন, “এটা কি একজন মানুষের সারা জীবনের স্বপ্ন হতে পারে? ঠিক আছে, পৃথিবীর সবচে’ সুন্দরী কুমারীটি আমি তোমাকে দিলাম। তবে এ জন্য তোমাকে আরো আঠারো বছর অপো করতে হবে”- ঈশ্বর শর্ত দিলেন। “আমি প্রতীক্ষা করতে রাজী আছি”- দৃঢ় কণ্ঠে অবিবাহিত উত্তর দিলো এবং ফিরে গেলো।
এবার বিবাহিত এলো ঈশ্বরের কাছে। ঈশ্বর তার কাছেও জানতে চাইলেন, “কী আবেদন তোমার, পেশ করো।” অত্যন্ত বিনীত হয়ে সে চাইলো, “পৃথিবীর সবচে’ সুন্দরী কুমারীটি আমায় দিন।” ঈশ্বর বাঁকা চোখে চেয়ে বললেন, “কিন্তু তুমি তো বিবাহিত?” “আমি আমার স্ত্রী’র উপর সন্তুষ্ট নই”Ñবিবাহিত উত্তর করলো। ঈশ্বর মৃদু হাসলেন। তারপর অনুভূতিহীন দৃষ্টিতে বিবাহিতকে দেখলেন। বললেন, “ঠিক আছে, পৃথিবীর সবচে’ সুন্দরী কুমারীটি আমি তোমাকে দিলাম।” বিবাহিতজন অত্যন্ত খুশি হয়ে ফিরে গেলো।
...কিছুদিন পর, বিবাহিতের স্ত্রী একটি কন্যা সন্তানের জন্ম দিলো। তার মুখ দেখে বিবাহিত খুব দুঃখ পেলো। বুঝতে পারলো, ঈশ্বর তাঁর প্রতিশ্র“তি পূরণ করেছেন। ১৭ বছর পর মেয়েটির মা-বাবা এক দুর্ঘটনায় মৃত্যু বরণ করে। তার ১ বছর পর পিতৃ-মাতৃহীন অসহায় ঐ মেয়েটিকে তার আত্মীয়-স্বজনেরা তার চে’ ৩০ বছরের বড় প্রায় বৃদ্ধ এক লোকের সাথে বিয়ে দেয়। এটি ছিলো লোকটির প্রথম বিয়ে।
ঈশ্বর! দয়া করে বলবেন কি, মেয়েটার কী অপরাধ ছিল?
একটি মৃত্যু সংবাদ
ধরো, তুমি একটা গাছ হলে আর আমি এক পথিক। মনে করো, সময়টা মধ্য দুপুর। সুর্যটা তার সবটুকু প্রাণশক্তিকে আমার মাথায় ঢেলে দিচ্ছিল। আমার পে আর পথচলা সম্ভব হচ্ছিল না। আমি যখন তোমার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, তুমি আমায় ডাকলে, “পথিক, বসে যাও দু’দণ্ড। আমার ছায়ায় তোমার ভালো লাগবে।” ঘামে সিক্ত শরীরটা নিয়ে আমি তোমার শেকড়ে মাথা রেখে শুয়ে পড়লাম, যেন তোমার কোলে মাথা রেখেছি। তুমি তোমার ডালপালাগুলো অনেক নিচে নামিয়ে আনলে যাতে ছায়াটা আরো বেশি গাঢ় হয়। তোমার পাতাগুলো আলতো আলতো দোলাতে লাগলে, মনে হলো আমার মাথায় যেন তুমি হাত বুলিয়ে দিচ্ছো। মৃদু বাতাস তোমার পাতার ফাঁক দিয়ে যাবার সময় এমনভাবে শব্দ উৎপাদন করছিলো, মনে হয় তুমি আমার কানে ফিসফিসিয়ে কিছু বলছো। আমি চোখ বুজে কান পেতে রইলাম। “কতদূর যাবে?”-তুমি জানতে চাইলে। “জানি না”- ক্লান্ত স্বরে আমি বললাম। “জানো না!”-তুমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলে। “না”- আমি অস্ফুট স্বরে বলতে লাগলাম, “শুধু জানি, এ পথ ধরে আমাকে চলতেই হবে।” “এত কষ্ট করে কী লাভ? আমার কাছে থেকে যাও, আমি তোমাকে পরম শান্তিতে ঘুম পাড়িয়ে রাখবো, রৌদ্র-তাপ তোমাকে স্পর্শও করতে পারবে না, তোমার শরীরে কখনো কান্তি আসতে দেবো না, তোমার প্রশান্তির জন্য যা যা প্রয়োজন, তা-ই তোমাকে আমি দেবো। তুমি কেবল আমার কাছে থেকে যাও”- এক নিঃশ্বাসে তুমি সবটুকু কথা বললে, যেভাবে প্রচণ্ড নেশাগ্রস্থ কেউ এক নিঃশ্বাসে একটা বোতল খালি করে ফেলে। আমার চোখে ততণে রাজ্যের ঘুম নেমে এসেছে। আমি ঘুম জড়ানো কণ্ঠে তোমাকে বললাম, “নাহ্। সেটা সম্ভব না, আমাকে যেতেই হবে।” তুমি কিছুই বললে না। একদম নিশ্চুপ হয়ে গেলে। প্রচণ্ড ঝড়ের আগে প্রকৃতি যেভাবে শান্ত হয়ে যায় সেভাবেই তুমি নিরব-নিস্পন্দ হয়ে গেলে। আমি নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। কারণ তুমি যে মাতৃময়ী, সেটা আমার জানা ছিল। কিন্তু তুমি যে রাসী সেটা আমার জানা ছিলো না। যখন জানতে পেরেছিলাম, তখন অনেক দেরী হয়ে গেছে, আমার আর কিছুই করার ছিলো না...
পরিশিষ্ট: সেদিন বিকেলে নদীর ধারের মাটির রাস্তাটা দিয়ে হেঁটে যাবার সময় বড় গাছটার নিচে সবাই একটা লাশ পড়ে থাকতে দেখলো। লোকটা হয়তো বিশ্রাম নিচ্ছিলো, প্রচণ্ড বাতাসের তোড়ে গাছটার একটা বড় ডাল লোকটার মাথার উপর ভেঙ্গে পড়ায় তার মাথাটা একেবারে থেতলে গিয়েছিলো। এতেই তার মৃত্যু হয়। স্থানীয় সংবাদপত্রে খবরটা এভাবেই ছাপা হয়।
প্রতি অর্বাচীন
অ নু গ দ্য
রাফসান গালিব
রাফসান গালিব
দুই নাম্বার ইট দিয়ে বানালে দেয়াল কি কখনো মজবুত হয়? তার উপর সিমেন্টে ভেজাল। এত কষ্ট করে শ্রমিক নিয়োগ করে দেয়াল বানালে, ক’দিন না যেতেই তো নড়ে উঠবে। একটু হেলান দিলেই যেন পড়ে যাবে। ভূমিকম্প হলেতো আমও যাবে ছালাও যাবে। তোমার কাছে শক্ত এই দেয়াল আমার বিশ্বাসের কাছে একেবারেই ঠুনকো আর নড়বড়ে। এভাবে কি পারবে তুমি আমার দৃষ্টির সীমানায় দেয়াল দিতে। দেয়ালের ওপাশে পদ্মপুকুরে খেলা করা হাঁসের জ্বলজ্বল করা সাদা পালক আমি দেখতে পাবো না, তা কি হয়? মৌলভী বাড়ির বিড়ালছানাগুলো তো ঠিকই এই দেয়াল পার হয়ে আমার দৃষ্টিতে ওম খুঁজে নেবে। তালগাছ সমান দেয়ালটাকে উঁচু করেছ যাতে আমি বাবুই পাখির বাসা দেখতে না পারি। তুমি তো জান না, প্রতি রাতে বাবুইরা উড়ে এসে আমার হাত থেকে আমার সাতপুরুষের উৎপাদিত অবশিষ্ট শস্যদানা খেয়ে যায় আর বুনন শিখিয়ে যায় আমাকে। শীতপাখিরা ঠিকই আমাকে রোদ এনে দেবে আর আমি রৌদ্র সীমানায় গা এলিয়ে দেব আরাম করে। কুড়ানো ধানের খই ভাজার স্বাদ তো তোমার এই ঠুনকো দেয়াল দমিয়ে রাখতে পারবে না কখনো। ইঁদুরগুলো কবেই ক্ষেতের আলের গর্তমুখে আমার জন্য ঝুটা ধান কুড়িয়ে রেখেছে। তুমি দেখলে হতবাক হয়ে যাবে। অবাক লাগে এই নড়বড়ে দেয়ালের সাথে তুমি আবার দু’জন প্রহরীও রেখেছ আমার গতিবিধি ল্য রাখার জন্য। প্রজাপতিরা কবেই তাদের ঘুম পাড়িয়ে রাখবে তুমি বুঝতেই পারবে না।
যতই শক্ত করে দেয়াল বানাও না কেন তা আমার জন্য কিছুই না। হয়তোবা আমার হাত-পা বাঁধা পড়ে আছে। কতগুলো নপুংশক তৈলাক্ত জীবের আশকারায় এই আঙিনায় প্রবেশ করেছ তুমি। তোমাকে দেখে আমি মোহিত হলাম, আনন্দিত হলাম, তোমার মধুর কথায় সুখ খুঁজতে লাগলাম, মন ভুলানো খেলায় মজে গেলাম আমি। তোমার চটকদার হাসিতে আমার আদিপুরুষের লালিত সফেদ পায়রা ছিঁড়তে লাগলাম একে একে। পূর্ণিমার রাতে তোমার ণিকের প্রাণকাড়া সঙ্গীত-মূর্ছনায় ভুলে গেলাম কৃষ্ণ রাখালের পাতার বাঁশি।
একসময় নিজে নিজেই বন্দী হয়ে গেলাম। দুর্বল হয়ে পড়ি আস্তে আস্তে। মাঝে মাঝে তোমার ঐ নড়বড়ে দেয়াল আমার কাছে চীনের মহাপ্রাচীর রূপে ধরা দেয়। অথচ আমাদের আদিপুরুষেরা শত দেয়াল ভেঙ্গেছিল অনায়াশে, আমরা তা ভুলে গেলাম, হয়তো সে সব দেয়াল সহজে দৃশ্যমান ছিল বলে। তবে আমাদের সাহস, অদম্য ইচ্ছা আর স্পর্ধা টিকিয়ে রেখেছে এখনো আমাদের। যে মাটি পুড়ে দেয়ালের ইট তৈরী হয় আমরা তো সে মাটিরই সন্তান। তাই না!
Subscribe to:
Posts (Atom)


